মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল আ'লা কায়সী (রহঃ) ..... সাঈদ ইবনু জুবায়র (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) কে বলা হলো, নাওফ দাবী করে যে, মূসা (আঃ) যিনি জ্ঞান অনুসন্ধানে বেরিয়ে ছিলেন, তিনি বনী ইসরাঈলের মূসা নন। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, হে সাঈদ। তুমি কি তাকে এ কথা বলতে শুনেছ? আমি বললাম, হ্যাঁ! তিনি বললেন, নাওফ মিথ্যারোপ করেছে। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৯৪৯, ইসলামিক সেন্টার)
উবাই ইবনু কা'ব (রাযিঃ) আমাদের নিকট রিওয়ায়াত করেছেন যে, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মূসা (আঃ) একদা তার গোষ্ঠীর সম্মুখে আল্লাহ তা'আলার নিআমাত এবং বালা-মুসীবাত মনে করিয়ে উপদেশ দিচ্ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলে ফেললেন, দুনিয়াতে আমার তুলনায় উত্তম এবং অধিক জ্ঞানী কোন লোক আছে বলে আমার জানা নেই। আল্লাহ মূসা (আঃ) এর প্রতি ওয়াহী পাঠালেনঃ আমি জানি মূসার চাইতে উত্তম কে বা কার নিকট কল্যাণ রয়েছে। পৃথিবীতে অবশ্যই এক লোক রয়েছে যে, তোমার তুলনায় অধিক জ্ঞানী। মূসা (আঃ) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তার পথ জানিয়ে দিন। তাকে বলা হলো, লবণাক্ত একটি মাছ সাথে নিয়ে যাও। এ মাছটি যেখানে হারিয়ে যাবে খানেই সে, ব্যক্তি আছে। মূসা (আঃ) এবং তার খাদিম রওনা হলেন, পরিশেষে তারা একটি বড় পাথরের নিকট পৌছলেন। সে সময় মূসা (আঃ) তার সঙ্গীকে রেখে গোপনে চলে গেলেন। তারপর মাছটি ছটফট করে পানিতে নেমে গেল এবং পানিও ছিদ্রের মতো রয়ে গেল, মাছের রাস্তায় সংমিশ্রণ হলো না। মূসা (আঃ) এর খাদিম বললেন, হ্যাঁ, আমি আল্লাহর নবীর সঙ্গে মিলিত হয়ে তাকে এ বিবরণ দিব। তারপরে তিনি ভুলে গেলেন। তারা যখন আরো সম্মুখে চলে গেলেন। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আমার নাশতা দাও, এ সফরে তো আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যতক্ষণ তারা এ জায়গাটি ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের ক্লান্তি আসেনি। তার সাথীর যখন স্মরণে আসলো তখন বলল, আপনি কি জানেন যখন আমরা পাথরের নিকট আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গেছি। আর শাইতানই আমাকে আপনার নিকট বলার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে এবং অবাক করার মতো মাছটি সমুদ্রে তার রাস্তা করে নিয়েছে। মূসা (আঃ) বললেন, এ-ই তো ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। সুতরাং তারা পথ অনুসরণ করে প্রত্যাবর্তন করলেন। তখন তার খাদিম মাছের জায়গাটি তাকে দেখালো। মূসা (আঃ) বললেন, এ জায়গার বর্ণনাই আমাকে দেয়া হয়েছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর মূসা (আঃ) সন্ধান করছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি কাপড়ে ঢাকা খাযির (আঃ) কে গলদেশের উপর চীৎ হয়ে ঘুমানো দেখতে পেলেন। কিংবা অন্য বর্ণনায়, গলদেশের উপর সোজাসুজি। মূসা (আঃ) বললেন, আসসালামু 'আলাইকুম। খাযির (আঃ) মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, ওয়া আলাইকুমুসসালাম, তুমি কে? মূসা (আঃ) বললেন, আমি মূসা। তিনি বললেন, কোন মূসা? মূসা (আঃ) উত্তর দিলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা। খাযির (আঃ) বললেন, তোমার এ মহান আগমন কিসের জন্য? মূসা (আঃ) বললেন, আমি এসেছি যেন আপনাকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে তা হতে আপনি আমায় কিছু শিক্ষা দেন। খাযির (আঃ) বললেন, আমার সাথে তুমি ধৈর্য ধরতে পারবে না। আর এমন ব্যাপারে কেমন করে তুমি ধৈর্য ধরবে, যার ইলম তোমাকে দেয়া হয়নি। এরূপ বিষয় হতে পারে যা করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তুমি যখন তা দেখবে তখন তুমি ধৈর্য ধারণ করবে না। মূসা (আঃ) বললেন, ইনশাআল্লাহ্ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যেই পাবেন। আর আমি আপনার কোন আদেশ অমান্য করব না। খাযির (আঃ) বললেন, তুমি যদি আমার অনুগামী হও তবে আমাকে কোন ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো না, যতক্ষণ না আমি নিজেই এ ব্যাপারে বর্ণনা করি। তারপর উভয়ই চললেন, পরিশেষে একটি নৌকায় চড়লেন। তখন খাযির (আঃ) নৌকার একাংশ ভেঙ্গে ফেললেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেন, আপনি কি নৌকাটি ভেঙ্গে ফেললেন, নৌকারোহীদের ডুবিয়ে ফেলার জন্যে? আপনি তো বড় মারাত্মক কাজ করেছেন। খাযির (আঃ) বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবে না? মূসা (আঃ) বললেন, আমি ভুলে গিয়েছি, আপনি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করবেন না। আমার ব্যাপারটিকে আপনি কঠিন করবেন না। পুনরায় উভয়ে চলতে লাগলেন। এক স্থানে দেখতে পেলেন বালকরা খেলায় লিপ্ত। খাযির (আঃ) অবলীলাক্রমে একটি শিশুর নিকট গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। এতে মূসা (আঃ) খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, আপনি প্রাণ বিনিময় ছাড়াই একটি নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করলেন? আপনি বড়ই নৃশংস কাজ করেছেন। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন আমাদের ও মূসা (আঃ) এর উপর তিনি যদি জলদি না করতেন তাহলে অবাক হওয়ার আরো মতো অনেক ঘটনা দেখতে পেতেন। তবে তিনি খাযির (আঃ) এর সম্মুখে লজ্জিত হয়ে বললেন, তারপর যদি আমি আপনাকে আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করি তবে আপনি আমায় সাথে রাখবেন না। সত্যিই আমার ব্যাপার খুবই আপত্তিকর হয়েছে। যদি মূসা (আঃ) ধৈর্য ধরতেন তাহলে আরো বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেতেন। যখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন নবীর বর্ণনা করতেন, প্রথমে নিজকে দিয়ে আরম্ভ করতেন আর বলতেন, আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন এবং আমার অমুক ভাইয়ের উপরও। এভাবে নিজেদের উপর আল্লাহর রহমত কামনা করতেন। অতঃপর দু'জনে চললেন এবং মন্দ লোকদের একটি লোকালয়ে গিয়ে উঠলেন। তারা লোকদের অসংখ্য জায়গায় ঘুরে তাদের নিকট খাবার চাইলেন। তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। তারপর তারা ধ্বসে পড়ার উপক্রম একটা দেয়াল দেখতে পেলেন। খাযির (আঃ) সেটি মেরামত করে দিলেন। মূসা (আঃ) বললেন, আপনি চাইলে এর বিনিময়ে মজুরি নিতে পারতেন। খাযির (আঃ) বললেন, এখানেই আমার আর তোমার মাঝে সম্পর্কচ্ছেদ। খাযির (আঃ) মূসা (আঃ)-এর বস্ত্র ধরে বললেন, তুমি যেসব বিষয়ের উপর ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছিলে সে সবের ঘটনা বলে দিচ্ছি। নৌকাটি ছিল কিছু গরীব লোকের যারা সমুদ্রে কাজ করত’- আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়লেন। তারপর যখন এটাকে দখল করতে লোক আসলো, তখন ছিদ্রযুক্ত (অচলাবস্থা) দেখে ছেড়ে দিল। অতঃপর নৌকাওয়ালারা একটা কাঠ দ্বারা নৌকাটি মেরামত করে নিলো। আর বালকটি সূচনালগ্নেই ছিল কাফির। তার মা-বাবা তাকে বড়ই আদর করত। সে বড় হলে ওদের দু’জনকেই অবাধ্যতা ও কুফুরীর দিকে নিয়ে যেত। অতএব আমি আকাঙ্ক্ষা করলাম, আল্লাহ যেন তাদেরকে এর বিনিময়ে আরো উত্তম পবিত্র স্বভাবের ও অধিক স্নেহভাজন ছেলে দান করেন। আর দেয়ালটি ছিল শহরের দু'টো ইয়াতীম বালকের’- আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৯৪৯, ইসলামিক সেন্টার)
হারমালাহ ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) ..... 'আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করেন, ইবনু আব্বাস এবং কায়স ইবনু হিসন, মূসা (আঃ) এর সঙ্গী সম্পর্কে তর্ক করলেন। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বললেন, সঙ্গীটি খাযির (আঃ) ছিলেন। অতঃপর সেখানে উবাই ইবনু কা'ব (রাযিঃ) আসলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) তাকে বললেন, হে আবূ তুফায়ল! এদিকে আসুন, আমি এবং সে তর্ক করছি— মূসা (আঃ) এর সঙ্গীর সম্বন্ধে যার নিকট তিনি গিয়েছিলেন। আপনি কি এ সম্বন্ধে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে কিছু জেনেছেন? উবাই ইবনু কা'ব (রাযিঃ) বললেন, আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, মূসা (আঃ) এক সমাবেশে কিছু বলছিলেন, এমতাবস্থায় একটা লোক এসে জিজ্ঞেস করল, আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞানী কোন লোক সম্বন্ধে কি আপনার জানা আছে? মূসা (আঃ) বললেন, না। তখন আল্লাহ ওয়াহী প্রেরণ করলেন, আমার বান্দা খাযির তোমার তুলনায় অধিক জানেন। মূসা (আঃ) খাযির (আঃ) এর সাথে দেখার করার উপায় জানতে চাইলেন। আল্লাহ তা'আলা মাছকে নমুনা হিসেবে চিহ্নিত করলেন এবং আদেশ করা হলো, যখন তুমি মাছটি হারিয়ে ফেলবে তখন ফিরবে আর তার দর্শনও পাবে। মূসা (আঃ) আল্লাহর ইচ্ছা মতো চললেন। তারপর তার সঙ্গীকে বললেন, আমাদের নাস্তা বের করো। খাদিম বলল, আপনার কি জানা আছে যে, যখন আমরা সাখরাহ্ (পাথরের নিকট) পৌঁছলাম তখন মাছের কথা ভুলে গিয়েছি; আর শাইতানই আমাদের ভুলে দেয়ার কারণ। মূসা (আঃ) বললেন, এটাই তো আমরা প্রত্যাশা করতাম। সুতরাং দু’জনেই পদাঙ্ক অনুসরণ করে ফিরলেন এবং খাযির (আঃ) কে পেলেন। পরবর্তী ঘটনা আল্লাহ তা'আলা তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ইউনুস (রহঃ) এর বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, তারা সমুদ্রগামী মাছটির নিদর্শন অনুসরণ করে ফিরলেন'। (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৫৯৫২, ইসলামিক সেন্টার)