। আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, "উমার ইবনুল খাত্তাব (রাযিঃ) বলেছেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি মাকামে ইবরাহীমকে যদি নামাযের জায়গা হিসেবে গ্রহণ করতেন! এ প্রসঙ্গেই অবতীর্ণ হয়ঃ “ওয়াত্তাখিযু মিম মাকামি ইবরাহীমা মুসাল্লা”। তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের জায়গা বানিয়ে নাও। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। ইবনু উমার (রাযিঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে।
। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “এভাবে আমি তোমাদেরকে এক ন্যায়নিষ্ঠ জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি" (সূরা বাকারাহ ১৪৩) প্রসঙ্গে বলেছেনঃ ওয়াসাতান অর্থ আদলান (ন্যায়নিষ্ঠ)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৮৭), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবূ সাঈদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (কিয়ামত দিবসে) নূহ (আঃ)-কে ডেকে বলা হবে, তুমি কি (তোমার সম্প্রদায়কে আল্লাহ তা'আলার বাণী) পৌছে দিয়েছিলে? তিনি বলবেনঃ হ্যাঁ। তারপর তার সম্প্রদায়কে ডেকে প্রশ্ন করা হবেঃ তিনি কি তোমাদের নিকট (আল্লাহ তা'আলার বাণী) পৌছিয়েছিলেন? তারা বলবে, আমাদের নিকট কোন সতর্ককারী আসেনি। আমাদের নিকট কেউই আসেনি। তখন তাকে বলা হবে, আপনার সাক্ষী কারা? তিনি বলবেনঃ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার উন্মাতগণ। তারপর তোমাদেরকে ডেকে আনা হবে। তোমরা সাক্ষ্য দিবে যে, নিশ্চয়ই তিনি (দাওয়াত) পৌঁছে দিয়েছিলেন। তার প্রামাণ হচ্ছে বারাকাতময় আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “এভাবে আমি তোমাদেরকে এক ন্যায়নিষ্ঠ জাতিরূপে প্রতিষ্ঠিত করেছি। যাতে তোমরা মানব জাতির জন্য সাক্ষীস্বরূপ এবং রাসূল তোমাদের সাক্ষীস্বরূপ হবে”— (সূরা আল-বাকুরাহ ১৪৩)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৮৭)। মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার-জাফার ইবনু ‘আওন হতে, তিনি আমাশ (রাহঃ) হতে এই সূত্রেও একই রকম বর্ণনা করেছেন। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। আল-বারাআ ইবনু আযিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদীনায় পদার্পণ করে ষোল বা সতের মাস পর্যন্ত বাইতুল মাকদিসের দিকে (ফিরে) নামায আদায় করেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা'বার দিকে (মুখ করে) নামায আদায় করার আগ্রহ পোষণ করতেন। এ প্রেক্ষিতেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “আকাশের দিকে তোমার বারবার তাকানোকে আমি অবশ্যই লক্ষ্য করেছি। কাজেই আমি তোমাকে অবশ্যই এমন কিবলার দিকে ফিরিয়ে দিচ্ছি যা তুমি পছন্দ কর। অতএব তুমি মাসজিদুল হারামের দিকে তোমার মুখ ফিরাও”— (সূরা আল-বাক্কারাহঃ ১৪৫)। ফলে কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হলো। আর তিনি এটাই পছন্দ করতেন। এক লোক তার সাথে আসরের নামায আদায় করে একদল আনসারীর সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা তখন বাইতুল মাকদিসের দিকে (মুখ করে) আসরের নামাযের রুকূতে ছিল। তিনি বললেন, এই লোকটি সাক্ষ্য দিচ্ছে যে, সে রাসূলুল্লাহ -এর সাথে নামায আদায় করে এসেছে। আর প্রকৃত অবস্থা এই যে, (নামাযে) কাবার দিকে মুখ ফিরানো হয়েছে। তারাও তৎক্ষণাৎ রুকূ’ অবস্থায়ই (কাবার দিকে) ঘুরে যান। সহীহঃ সিফাতুস সালাত, বুখারী (৪৪৯২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। সুফইয়ান সাওরীও এটি আবূ ইসহাক হতে বর্ণনা করেছেন।
। ইবনু উমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, তারা (কুবা মসজিদে) ফজরের নামাযে রুকু অবস্থায় ছিলেন। সহীহঃ প্রাগুক্ত, ইরওয়াহ (২৯০), বুখারী (৪৪৮৮), মুসলিম। এ অনুচ্ছেদে আমর ইবনু আওফ আল-মুযানী, ইবনু উমার, উমারাহ ইবনু আওস ও আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) হতেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ ঈসা বলেন, ইবনু উমর (রাযিঃ)-এর বর্ণিত হাদীসটি হাসান সহীহ।
। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কাবার দিকে ফিরিয়ে দেয়া হলে সাহাবীগণ তাকে প্রশ্ন করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের যেসব ভাই বাইতুল মাকদিসের দিকে (ফিরে) নামায আদায় করা অবস্থায় মারা গেছেন তাদের কি হবে? আল্লাহ তা'আলা তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমানকে বিনষ্ট করেন না”— (সূরা আল-বাকারাহঃ ১৪৩)। সহীহ লিগাইরিহীঃ তা’লীকাতু হাসান (১৭১৪), বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। উরওয়া (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়িশাহ (রাযিঃ)-কে বললাম, যে ব্যক্তি সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ (সাঈ) করেনি আমি তাতে সমস্যা মনে করি না। আমি নিজেও এ দুই পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ না করতে কোন পরোয়া করি না। আয়িশাহ্ (রাযিঃ) বললেন, হে আমার বোন পুত্র! তুমি যা বললে তা খুবই অন্যায় কথা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই দুই পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ করেছেন, মুসলিমরাও এর তাওয়াফ করেছেন। তবে মুশাল্লাল’ নামক স্থানে স্থাপিত মানাত নামক প্রতিমার নামে যেসব কাফির ইহরাম বাধতো তারা সাফা ও মারওয়ার তাওয়াফ করত না। অতঃপর বারকাতময় আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করেনঃ “যে লোক বাইতুল্লাহর হজ্জ করে বা উমরা করে এই পাহাড়দ্বয়ের মাঝে তাওয়াফ করায় তার কোন সমস্যা নেই”- (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। তোমাদের কথাই যদি সঠিক হত, তাহলে এভাবে বলা হতঃ “ফালা জুনাহা আলাইহি আল-লা ইয়াত্তাওয়াফা বিহিমা” (এই পাহাড়দ্বয়ের মাঝে তাওয়াফ না করাতে কোন সমস্যা নেই)। যুহরী (রাহঃ) বলেন, আমি আবূ বাকর ইবনু আবদুর রাহমান ইবনুল হারিস ইবনু হিশামের নিকট এটি বর্ণনা করলে তিনি খুবই আনন্দিত হন এবং বলেন, এটা তো হল ইলমের (জ্ঞানের) কথা! আমি বহু আলিমকে বলতে শুনেছি, যেসব আরববাসী সাফা-মারওয়ার তাওয়াফ করে না তারা বলে, এ দুটি পাহাড়ের মাঝে তাওয়াফ করা জাহিলী যুগের প্রথা। অপর দিকে কিছু সংখ্যক আনসারী বলত, আমাদেরকে বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করার আদেশ করা হয়েছে এবং সাফা-মারওয়ার মাঝে তাওয়াফের আদেশ দেয়া হয়নি। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করলেনঃ “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা'আলার নির্দেশনসমূহের অন্তর্ভুক্ত”– (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। আবূ বাকর ইবনু আবদুর রাহমান বলেন, আমার মতে উপরোক্ত উভয় দলের প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৯৮৬), বুখারী (৪৪৯৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। আসিম আল-আওয়াল (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ)-কে সাফা ও মারওয়া প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলাম। তিনি বললেন, এ দু'টি (পাহাড়) ছিল জাহিলিয়াতের নিদর্শন। ইসলামের আবির্ভাব হলে আমরা এতদুভয়ের মাঝে সাঈ করা হতে বিরত থাকলাম। তখন বারকাতময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “সাফা ও মারওয়া হল আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। অতএব বাইতুল্লাহর হজ্জকারী বা উমরাকারী ব্যক্তির জন্য এতদুভয়ের মাঝে তাওয়াফ করাতে কোন সমস্যা নেই”- (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। আনাস (রাযিঃ) বলেন, এটা হল নফল ইবাদাত। আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ “কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৎকাজ করলে আল্লাহ তা'আলা তো গুণগ্রাহী ও সর্বজ্ঞ” (সূরা আল-বাকুরাহ ১৫৮)। সহীহঃ বুখারী (৪৪৯৬), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এই হাদীসটি হাসান সহীহ।
। জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন, তখন সাতবার বাইতুল্লাহর তাওয়াফ করলেন। তখন আমি তাকে এ আয়াত পাঠ করতে শুনলাম (অনুবাদ) “তোমরা ইবরাহীমের দাঁড়াবার স্থানকে নামাযের স্থানরূপে গ্রহণ কর”— (সূরা আল-বাকারাহ ১২৫)। তারপর তিনি মাকামে ইবরাহীমের পিছনে নামায আদায় করলেন, তারপর হাজরে আসওয়াদের নিকট এসে তাতে চুমু দিলেন, তারপর বললেনঃ আল্লাহ তা'আলা প্রথমে যা উল্লেখ করেছেন আমরা তা হতে শুরু করব। অতঃপর তিনি তিলাওয়াত করলেনঃ “সাফা ও মারওয়া আল্লাহ তা'আলার নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত"- (সূরা আল-বাকারাহ ১৫৮)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (২৯৬০), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। আল-বারাআ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণের এ নিয়ম ছিল যে, কোন রোযাদার ইফতারের পূর্বে ঘুমিয়ে পড়লে তিনি সেই রাত ও পরবর্তী দিনে কিছু খেতেন না, এভাবে পরবর্তী সন্ধ্যা পর্যন্ত অভুক্ত থাকতেন। একবার কাইস ইবনু সিরমাহ আল-আনসারী (রাযিঃ) রোযা অবস্থায় ছিলেন। ইফতারের সময় উপস্থিত হলে তিনি তার স্ত্রীর নিকট এসে বললেন, কোন খাবার আছে কি? তার স্ত্রী বললেন, না। তবে আমি আপনার জন্য কিছু খুঁজে আনতে যাচ্ছি। কাইস (রাযিঃ) ঐ দিন কায়িক পরিশ্রম করেছিলেন। তাই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। তার স্ত্রী এসে তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় দেখতে পেয়ে বললেন, আপনার জন্য আফসোস! পরবর্তী দিন দুপুর হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন। এ ঘটনা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট বর্ণনা করা হলে তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) 'রোযার রাতে তোমাদের জন্য স্ত্রী সম্ভোগ হালাল করা হল” (সূরাঃ আল-বাকারাহ ১৮৭)। এতে তারা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। আয়াতের শেষাংশ নিম্নরূপ (অনুবাদ) “রাতের কালো রেখা হতে ভোরের সাদা রেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা পানাহার কর”— (সূরা আল-বাকারাহ ১৮৭)। সহীহঃ সহীহ আবূ দাউদ (২০৩৪), বুখারী ও মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। নুমান ইবনু বাশীর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বাণী “তোমাদের প্রভু বলেন, তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব”— (সূরা মু'মিন ৬০) প্রসঙ্গে বলেছেনঃ দু'আও একটি ইবাদাত। তারপর তিনি পাঠ করলেনঃ "তোমাদের প্রভু বলেন, তোমারা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব। যারা অহংকারবশে আমার ইবাদাতে বিমুখ, তারা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে” (সূরা মু'মিন ৬০)। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৩৮২৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।