। আবূ শুৱাইহ আল-কাবী (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা মক্কাকে হারাম (সম্মানিত) করেছেন, কোন মানুষ একে হারাম ঘোষণা করেনি। আল্লাহ ও পরকালের উপর যে লোক ঈমান রাখে সে যেন এখানে রক্তপাত (হত্যা) না করে এবং এখানকার কোন গাছপালা না কাটে। এখানে যদি কোন লোক (রক্ত প্রবাহের উদ্দেশ্যে) এই বলে অজুহাত খোজ করে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যও তো মক্কাকে হালাল করা হয়েছিল, তবে তার জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ শুধু আমার জন্যই একে হালাল করেছিলেন, অন্য কারো জন্য হালাল করেননি। আমার জন্যও শুধু একটা দিনের কিছু সময় হালাল করা হয়েছিল। তারপর তা কিয়ামত দিবস পর্যন্ত হারাম হয়ে গেছে। হে খুযাআ বংশের জনগণ! এরপরও হুযাইল গোত্রের এই লোককে তোমরা খুন করেছ। আমি তার রক্তপণ দিয়ে দিচ্ছি। আজকের পর হতে কোন লোকের কোন আপনজন নিহত হলে তার পরিবারের লোকজন দু'টি বিকল্পের মধ্যে যে কোন একটি গ্রহণ করবেঃ হয় তারা খুনীকে মেরে ফেলবে না হয় রক্তপণ গ্রহণ করবে। সহীহ, ইরওয়া (২২২০) এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। শাইবানও ইয়াহইয়ার নিকট হতে একই হাদীস বর্ণনা করেছেন। আৰূ শুরাইহ আল-খুযাঈ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ “যে ব্যক্তির কোন আপনজন নিহত হল, সে চাইলে খুনীকে মেরে ফেলতে পারে অথবা ক্ষমা করতে পারে অথবা রক্তপণ নিতে পারে।” এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ ও ইসহাক (রাহঃ) নিজেদের মতের সমর্থনে দলীল হিসাবে গ্রহণ করেছেন।
। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমলে এক লোক নিহত হল। তিনি খুনীকে মৃত ব্যক্তির অভিভাবকদের নিকট সোপর্দ করে দিলেন। খুনী ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল। আল্লাহর শপথ! তাকে মেরে ফেলার কোন ইচ্ছাই আমার ছিল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (মৃত ব্যক্তির অভিভাবকদের) বললেনঃ যদি সে সত্য কথা বলে থাকে এবং এ অবস্থায় তুমি তাকে হত্যা কর তবে তুমি জাহান্নামে যাবে। এ কথার ফলে সে খুনীকে মুক্ত করে দিল। সে চামড়ার রশি দ্বারা পিছন দিক থেকে বাধা ছিল। বর্ণনাকারী বলেন, সে রশি হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে বেরিয়ে গেল। এরপর হতে তার ডাকনাম হয়ে যায় রশিওয়ালা। সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৯০) এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। নিসআতুনঃ রশি
। সুলাইমান ইবনু বুরাইদা (রাঃ) হতে তার বাবার সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি (বুরাইদা) বলেন, যখন কোন লোককে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বাহিনীর আমীর করে পাঠাতেন তখন তাকে বিশেষকরে আল্লাহভীতির উপদেশ দিতেন এবং তার সাথের মুসলিমদের সাথে সৎ ও কল্যাণময় আচরণের নির্দেশ দিতেন। তিনি বলতেনঃ তোমরা আল্লাহর নামে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর, আল্লাহ তা'আলার সাথে কুফরকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, খিয়ানাত ও প্রতারণা কর না, বিশ্বাসঘাতকতা কর না। মুসলা (নাক, কান ইত্যাদি কর্তন) কর না এবং শিশুদের হত্যা কর না। সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৮৫৮), মুসলিম এ হাদীসের সাথে একটি ঘটনা আছে। ইবনু মাসউদ, শাদ্দাদ ইবনু আওস, ইমরান ইবনু হুসাইন, আনাম, সামুরা, মুগীরা, ইয়ালা ইবনু মুররা ও আবূ আইয়ূব (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। বুরাইদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। বন্দীদের বা নিহতের নাক, কান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ইত্যাদি কাটতে বিশেষজ্ঞ আলিমগণ নিষেধ করেছেন।
। শাদ্দাদ ইবনু আওস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা প্রতিটি জিনিসের প্রতি দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শনের আবশ্যকতা গণ্য করেছেন। অতএব তোমরা (কিসাসে অথবা জিহাদে) কোন লোককে হত্যা করলে উত্তম পন্থায় হত্যা করবে এবং কোন কিছু যবেহ করার সময় উত্তম পন্থায় যবেহ করবে। তোমাদের মধ্যে যে কেউ যেন তার ছুরি ভালভাবে ধারালো করে নেয় এবং যবেহ করার পশুটিকে আরাম দেয়। সহীহ, ইবনু মা-জাহ (৩১৭০), মুসলিম এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। আবূল আশআস-এর নাম শারাহীল, বাবার নাম আ-দাহ্।
। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, ভ্রুণের (গর্ভস্থিত বাচ্চার) রক্তপণ হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন যুবক গোলাম অথবা বাঁদী দেওয়ার ফায়সালা করেছেন। যে লোককে তিনি রক্তপণের নির্দেশ দিলেন সে বলল, আপনি এরূপ বাচ্চার রক্তপণ প্রদান করাবেন কি, যে পানও করেনি, খায়ওনি এবং চিৎকারও করেনি? এরূপ (খুনের কিসাস) তো বাতিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এ লোক তো কবিদের মত (প্রমাণহীন) কথা বলছে। হ্যাঁ, অবশ্যই এর রক্তপণ হিসেবে একজন যুবক গোলাম অথবা বাঁদী ধার্য হবে। সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৩৯), নাসা-ঈ হামল ইবনু মালিক ইবনু নাবিগা এবং মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। এ হাদীস মোতাবিক বিশেষজ্ঞ আলিমগণ আমল করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছেন, এক ‘গুররা হল একজন গোলাম অথবা একজন ক্রীতদাসী অথবা পাঁচ শত দিরহাম। আবার কেউ বলেছেন, অথবা একটি ঘোড়া বা একটি খচ্চর।
। মুগীরা ইবনু শুবা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, দু’জন স্ত্রীলোক একে অপরের সতীন ছিল। তাদের মধ্যে একে অন্যের উপর পাথর অথবা তাবুর খুঁটি ছুড়ে মারে। ফলে তার গর্ভপাত হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই ভ্রুণের রক্তপণ হিসেবে একটি যুবক অর্থাৎ গোলাম অথবা বাঁদী প্রদানের ফায়সালা দেন। তিনি ঐ মহিলাটির পিতার বংশের লোকদের উপর তা পরিশোধের দায় অর্পণ করেন। সহীহ, ইরওয়া (২৬০৬), নাসা-ঈ উপরোক্ত হাদীসের মত হাসান-যাইদ ইবনু হুবাব হতে, তিনি সুফিয়ান হতে, তিনি মানসূর (রাহঃ)-এর সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন।
। আবূ জুহাইফা (রাহঃ) বলেন, আমি আলী (রাঃ)-কে বললাম, হে আমীরুল মু'মিনীন। আপনাদের নিকট সাদা কাগজে কালো কিছু লেখা (কোন বিষয়ের ব্যাখ্যা) আছে কি যা আল্লাহ্ তা'আলার গ্রন্থে নেই? তিনি উত্তরে বললেন, সেই মহান সত্তার শপথ, যিনি শস্য আবির্ভূত করেছেন এবং প্রাণের সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা'আলা কুরআন মাজীদ প্রসঙ্গে একজন মানুষকে যে বিশেষ জ্ঞান দিয়েছেন এবং এই সহীফার মধ্যে যা কিছু আছে তার বেশি কিছু আমি জানি না। বর্ণনাকারী বলেন, আমি বললাম, সহীফার মধ্যে কি আছে? তিনি বললেন, তাতে রক্তপণ এবং দাসমুক্তি সম্পর্কিত বিধান আছে। তাতে আরো আছে, কাফিরের পরিবর্তে কোন মুমিনকে (কিসাসস্বরূপ) হত্যা করা যাবে না। সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৫৮) আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতেও এ অনুচ্ছেদে হাদীস বর্ণিত আছে। আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। এই হাদীস মোতাবিক একদল বিশেষজ্ঞ আলিম আমল করেছেন। সুফিয়ান সাওরী, মালিক ইবনু আনাস, শাফিঈ, আহমাদ ও ইসহাক (রহঃ) বলেছেন, কাফিরকে খুনের অপরাধে মুসলিমকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা যাবে না। অন্য এক দল বলেছেন, চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোন কাফিরকে খুন করার দায়ে মুসলিমকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা বৈধ। কিন্তু প্রথম মতই অনেক বেশি সহীহ।
। আমর ইবনু শুআইব (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কাফিরের পরিবর্তে কোন মুসলিম ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা যাবে না। হাসান সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৫৯) وَبِهَذَا الإِسْنَادِ عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " دِيَةُ عَقْلِ الْكَافِرِ نِصْفُ دِيَةِ عَقْلِ الْمُؤْمِنِ একই সনদসূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে আরো বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেনঃ “কাফিরের দিয়াত হচ্ছে মুসলিমের দিয়াতের অর্ধেক। হাসান, ইবনু মা-জাহ (২৬৪৪) এই অধ্যায়ে আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিত হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান বলেছেন। বিশেষজ্ঞ আলিমদের মধ্যে ইয়াহুদী ও নাসারাদের দিয়াত প্রসঙ্গে মতপার্থক্য আছে। এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে হাদীসে যা বর্ণিত হয়েছে একদল আলিম সেটাই গ্রহণ করেছেন। উমার ইবনু আবদুল আযীয (রহঃ) বলেছেন, ইয়াহুদী ও নাসারাদের দিয়াত মুসলিমদের দিয়াতের অর্ধেক হবে। একই কথা বলেছেন, আহমাদ ইবনু হাম্বল (রাহঃ)-ও। উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, চার হাজার দিরহাম হচ্ছে ইয়াহুদী ও নাসারাদের দিয়াত এবং আটশত দিরহাম হচ্ছে মাজুসীদের দিয়াত। একই কথা বলেছেন, ইমাম মালিক, শাফিঈ ও ইসহাকও। অন্য একদল বিশেষজ্ঞ আলিম বলেছেন, ইয়াহুদি নাসারাদের দিয়াত মুসলিমদের দিয়াতের সমান। সুফিয়ান সাওরী ও কুফাবাসীদের এই মত।
। সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার দাসকে হত্যা করবে আমরা (কিসাস স্বরূপ) তাকে হত্যা করব। আর যে ব্যক্তি তার দাসকে অঙ্গহানি করবে আমরা তাকে অঙ্গহানি করব। যঈফ, ইবনু মাজাহ (২৬৬৩) আবূ ঈসা বলেনঃ হাদীসটি হাসান গারীব। তাবেঈদের কিছু বিশেষজ্ঞ আলিম এ মত গ্রহণ করেছেন, ইব্রাহীম নাখঈ তাদেরই একজন। হাসান বাসরী আতা ইবনু আবী রাবাহ এবং কিছু বিদ্বানগণের মতে আযাদ ব্যক্তিকে দাসের বদলে কিসাস গ্রহণ করা যাবে না। তা হত্যার পরিবর্তেই হোক বা অঙ্গের পরিবর্তেই হোক। আহমাদ ও ইসহাকের অভিমত ইহাই। কেউ কেউ বলেছেন কোন ব্যক্তি যদি নিজস্ব গোলাম হত্যা করে তবে মালিককে হত্যা করা যাবে না। আর যদি অন্যের গোলাম হত্যা করে তবে তাকে হত্যা করা যাবে। সুফিয়ান সাওরী ও কুফাবাসীদের ইহাই অভিমত।
। সাইদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রহঃ) হতে বর্ণিত আছে, উমার (রাঃ) বলতেন, আকিলার (খুনীর পিতৃপক্ষীয় আত্মীয়) উপর দিয়াত ধার্য হয়ে থাকে এবং স্বামীর দিয়াতের ক্ষেত্রে স্ত্রী ওয়ারিস হয় না। এরপর তাকে যাহহাক ইবনু সুফিয়ান (রাঃ) জানান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লিখে পাঠানঃ আশইয়াম আয-যুবাবীর স্ত্রীকে তার স্বামীর দিয়াতের ওয়ারিস বানাও (তারপর তিনি পূর্বোক্ত অভিমত বাতিল করে দেন)। সহীহ, ইবনু মা-জাহ (২৬৪২) এ হাদীসটিকে আবূ ঈসা হাসান সহীহ বলেছেন। এ হাদীস অনুযায়ী অভিজ্ঞ আলিমগণ আমল করেছেন।