রেওয়ায়ত ৩৯. আবু হুরায়রা (রাঃ) হইতে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিয়াছেনঃ তোমরা অনবরত রোযা রাখা হইতে নিজদিগকে বাঁচাও। তোমরা অনবরত রোযা রাখা হইতে নিজদিগকে বাঁচাও। সাহাবীগণ বলিলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ! তবে আপনি যে অনবরত রোযা রাখেন! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলিলেনঃ আমি তোমাদের মত নহি। আমি রাত্রি যাপন করি (এই অবস্থায়) যে, আমার প্রভু আমাকে আহার দান করেন এবং পানীয় দান করেন।
হাদিস 671 — Muwatta Malik 18:42
Maqtu Daif
রেওয়ায়ত ৪০. ইয়াইয়া (রহঃ) বলেন, আমি মালিক (রহঃ)-কে বলতে শুনিয়াছি, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যে ব্যক্তির উপর ধারাবাহিকরূপে দুই মাসের রোযা ফরয হইয়াছে- ভুলে হত্যা অথবা যিহার[1] করা বাবদ। অতঃপর তাহার কোন কঠিন পীড়া হইয়াছে যদ্দরুন রোযা ভাঙিতে হইয়াছে। সে যদি আরোগ্য লাভ করে এবং রোযা রাখিতে সক্ষম হয়, তবে আমি (এই ব্যাপারে) যাহা শুনিয়াছি, তন্মধ্যে উত্তম হইল- সেই ব্যক্তির জন্য ইহাতে বিলম্ব করা জায়েয নহে। তাহার যে রোযা পূর্বে গত হইয়াছে, উহার উপর ভিত্তি করিয়া সে অবশিষ্ট রোযা রাখিবে। তদ্রুপ ভুলে হত্যার কারণে যে নারীর উপর রোযা ওয়াজিব হইয়াছে, সে তাহার রোযার মাঝখানে ঋতুমতী হইলে রোযা রাখিবে না। তবে পাক হইলে পর সে রোযা রাখিতে বিলম্ব করিবে না এবং যে রোযা পূর্বে রাখিয়াছে উহার উপর ভিত্তি করিয়া অবশিষ্ট রোযা রাখিবে। আল্লাহর কিতাবের বিধান মুতাবিক যাহার উপর দুই মাসের রোযা ধারাবাহিকভাবে রাখা ওয়াজিব হইয়াছে, তাহার জন্য পীড়াজনিত ব্যাপার ও ঋতুস্রাব ব্যতীত রোযা ভঙ্গ করা জায়েয নহে। এইরূপ ব্যক্তির জন্য সফর আরম্ভ করিয়া রোযা ভঙ্গ করারও অনুমতি নাই। যেরূপ কুরআনুল করীমে ইরশাদ করা হইয়াছে, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি রুগ্ন থাকে কিংবা সফরে থাকে, তবে সে অন্য দিন রোযা রাখিবে।ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন- মালিক (রহঃ) বলিয়াছেনঃ এই ব্যাপারে যাহা শুনিয়াছি, তাহার মধ্যে ইহাই আমার কাছে সর্বাপেক্ষা উত্তম।
রেওয়ায়ত ৪২. মালিক (রহঃ) বলেনঃ সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হইল সেই ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তি এক মাসের রোযার মানত করিয়াছে, তাহার জন্য নফল রোযা রাখা জায়েয কিনা? সাঈদ (রহঃ) বললেনঃ নফলের পূর্বে মানতের (রোযা) আরম্ভ করবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ সুলায়মান ইবন ইয়াসার (রহঃ) হইতেও আমার নিকট এইরূপ রেওয়ায়ত পৌছিয়াছে। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন- মালিক (রহঃ) বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তির মৃত্যু হইয়াছে অথচ তাহার উপর মানত রহিয়াছে গোলাম আযাদ করার অথবা সদকা প্রদানের অথবা কুরবানী করার। ফলে সে তাহার সম্পদ হইতে সেই মানত পূর্ণ করার অসিয়ত করিয়াছে। তবে সদকা এবং কুরবানী তাহার সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ হইতে পূর্ণ করা হইবে। মানতকে অন্যান্য নফল অসিয়তের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করা হইবে। তবে যদি অন্য অসিয়ত ও মানতের মত (ওয়াজিব) হয়। কারণ নফল কাজ বা নফল কাজের অসিয়ত ওয়াজিব অসিয়ত ও মানতের সমতুল্য নহে। মানত ইত্যাদি মৃত ব্যক্তির সকল সম্পদ হইতে আদায় না করিয়া এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ হইতে আদায় করা হইবে। যদি তাহার জন্য ইহা বৈধ হয়, তবে মুতাওয়াফফী (মৃত্যুর সন্নিকটে পৌছিয়াছে এমন ব্যক্তি) তাহার উপর ওয়াজিব বিষয়গুলিকে পিছাইয়া রাখিবে। এমতাবস্থায় যখন তাহার মৃত্যু উপস্থিত হইবে, তখন তাহার সম্পদের মালিক হইবে তাহার ওয়ারিসগণ, বিশেষত ঐ সকল বিষয় যেসব বিষয়ে তাহার পক্ষ হইতে তাকীদ করিবার জন্য তেমন কোন ব্যক্তি না থাকে। (স্বভাবতই ওয়ারিসগণ ঐসব মানত বা অসিয়ত পূর্ণ করিতে আগ্রহী হইবে না)। সকল সম্পদ হইতে ঐসব আদায় করা তাহার জন্য জায়েয হইলে সে এই সকল ব্যাপারে বিলম্ব করিবে। যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হইবে তখন সে উহা প্রকাশ করবে। হয়তো ঐ সকল (প্রকাশিত দাবি-দাওয়া) পূরণে তাহার সমস্ত সম্পত্তিই নিঃশেষ হইয়া যাইবে, তাহার জন্য ইহা জায়েয নহে।
রেওয়ায়ত ৪৩. আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ)-কে প্রশ্ন করা হইলঃ একজন আর একজনের পক্ষে রোযা রাখিবে কি? অথবা একজন অন্যজনের পক্ষে নামায পড়িবে কি? তিনি উত্তরে বলিলেনঃ একজন আর একজনের পক্ষে রোযা রাখিবে না এবং একে অপরের পক্ষে নামাযও পড়িবে না।
রেওয়ায়ত ৪৪. খালিদ ইবন আসলাম (রহঃ) বর্ণনা করেন- উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) রমযান মাসে মেঘাচ্ছন্ন এক দিনে ইফতার করিলেন। তিনি মনে করিলেন যে, সন্ধ্যা হইয়াছে এবং সূর্য ডুবিয়াছে। অতঃপর এক ব্যক্তি আসিয়া বলিলঃ হে আমিরুল মুমিনীন সূর্য উদিত হইয়াছে। উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) বললেনঃ বিষয়টির সমাধান সহজ, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি। মালিক (রহঃ) বলেনঃ উমর (রাঃ) ইহার দ্বারা আমাদের মতে কাযা মুরাদ নিয়াছেন। (আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী) তাহার উক্তি ‘বিষয়টির সমাধান সহজ’ ইহাতে মেহনতের স্বল্পতা ও ইহা সহজ হওয়াই তিনি বুঝাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেনঃ ইহার পরিবর্তে আর একদিন রোযা রাখিব।
রেওয়ায়ত ৪৬. ইবন শিহাব (রহঃ) হইতে বর্ণিত-আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস ও আবু হুরায়রা (রাঃ) তাহারা উভয়ে রমযানের কাযা সম্পর্কে ইখতিলাফ (মতপার্থক্য) করিয়াছেন। একজন বলিয়াছেন, কায রোযা পৃথক পৃথক রাখা হইবে। আর একজন বলিয়াছেন, পৃথক পৃথক রাখা যাইবে না (অর্থাৎ একাধারে রাখিতে হইবে)। তাঁহাদের উভয়ের মধ্যে কে বলিয়াছেন পৃথক করা যাইবে, কে বলিয়াছেন পৃথক করা যাইবে না, তাহা আমার (নির্দিষ্ট) জানা নাই।
রেওয়ায়ত ৪৭. নাফি' (রহঃ) হইতে বর্ণিত, আবদুল্লাহ ইবন উমর (রাঃ) বলতেনঃ যে রোযা অবস্থায় স্বেচ্ছায় বমি করে, তাহার উপর কায ওয়াজিব হইবে। আর যাহার অনিচ্ছাকৃত বমি হয়, তাহাকে করিতে হইবে না।
রেওয়ায়ত ৪৮. ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ (রহঃ) শুনিয়াছেন- সাঈদ ইবন মুসায়্যাব (রহঃ)-কে রমযানের কাযা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হইলে তিনি বলিতেনঃ আমার নিকট পছন্দনীয় হইতেছে রমযানের কাযাকে পৃথক না করিয়া একাধারে রাখা। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেনঃ মালিক (রহঃ)-কে আমি বলিতে শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি রমযানের কাযা পৃথক পৃথক করিয়া রাখিয়াছে সেই ব্যক্তিকে রোযা পুনরায় রাখিতে হইবে না। সেই রোযাই তাহার পক্ষে যথেষ্ট হইবে। কিন্তু আমার নিকট একাধারে রাখাই পছন্দনীয়। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেনঃ আমি মালিক (রহঃ)-কে বলিতে শুনিয়াছি, যে ব্যক্তি রমযানের রোযা অথবা অন্য কোন ওয়াজিব রোযায় ভুলবশত আহার করে অথবা পান করে তাহাকে সেই দিনের পরিবর্তে অন্য একদিন কাযা করিতে হইবে।
রেওয়ায়ত ৪৯. মালিক (রহঃ) বর্ণনা করেন- হুমায়দ ইবন কায়েস মক্কী (রহঃ) বলিয়াছেন যে, আমি মুজাহিদ (রহঃ)-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি বায়তুল্লাহ্ তওয়াফ করিতেছিলেন। এমন সময় তাহার নিকট একজন লোক আসিল এবং কাফফারার রোযা সম্পর্কে তাহাকে জিজ্ঞাসা করিল। উহা একাধারে রাখিতে হইবে, না আলাদা আলাদা রাখিতে পরিবে? হুমায়দ (রহঃ) বলিলেনঃ ইচ্ছা করিলে আলাদা আলাদা রাখিতে পারিবে। মুজাহিদ (রহঃ) বলিলেনঃ আলাদা আলাদা রাখিবে না, কারণ উবাই ইবন কা'ব (রাঃ)-এর কিরাআতে রহিয়াছে (ثَلاَثَةِ أَيَّامٍ مُتَتَابِعَاتٍ) অর্থাৎ তিন দিন একাধারে। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেন- মালিক (রহঃ) বলিয়াছেনঃ আমার নিকট পছন্দনীয় হইল, আল্লাহ্ তা'আলা কুরআনে যেরূপ নির্ধারিত করিয়াছেন সেইরূপ একাধারে রোযা রাখা। ইয়াহইয়া (রহঃ) বলেনঃ মালিক (রহঃ)-কে প্রশ্ন করা হইল এমন এক স্ত্রীলোক সম্পর্কে, যে স্ত্রীলোকের রমযানে ফজর হইয়াছে রোযাবস্থায়। হঠাৎ তাহার তাজা রক্ত বাহির হইল, ঋতুর নির্দিষ্ট সময় ছাড়া। অতঃপর সে লক্ষ্য রাখিবে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেইরূপ রক্ত দেখার জন্য কিন্তু কিছুই দেখিল না। অন্য একদিন ফজরে হঠাৎ আর এক দফা রূক্ত বাহির হইল কিন্তু ইহা পূর্বের তুলনায় কম। অতঃপর কয়েক দিন তাহার হায়েযের পূর্ব পর্যন্ত উহ বন্ধ রহিল। সেই স্ত্রীলোক নিজের নামায ও রোযার বিষয়ে কি কৱিবে? ইহার উত্তরে মালিক (রহঃ) বলেন, সেই রক্ত হয়েযে গণ্য হইবে। যখন উহা দেখিবে রোযা ছাড়িয়া দিবে এবং সেই রোযা পরে কাযা করিবে। তাহার রক্ত বন্ধ হইয়া গেলে সে গোসল করিবে এবং রোযা রাখিবে। মালিক (রহঃ)-এর নিকট প্রশ্ন করা হইল এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে, যে ব্যক্তি রমযানের শেষ দিন মুসলিম হইল, তাহাকে রমযানের সকল রোযা করিতে হইবে কি? এবং যেদিন মুসলিম হইয়াছে সেই দিনের (রোযার) কাযা তাহার উপর ওয়াজিব হইবে কি? মালিক (রহঃ) প্রশ্নের উত্তরে বলিলেনঃ তাহাকে বিগত রোযা কাযা করতে হইবে না। সে আগামীতে রোযা আরম্ভ করিবে, যেদিন মুসলিম হইয়াছে সেই দিনের রোযা রাখাটা আমার নিকট পছন্দনীয়।