রেওয়ায়ত ২২. আবু হুরায়রা (রাঃ) বলিতেনঃ যে সম্পদের যাকাত আদায় করা হয় নাই, কিয়ামতের দিন সেই সম্পদ এক সাদা বর্ণের মাথাওয়ালা সাপের রূপ ধারণ করবে। উহার চোখের উপর কাল দাগ হইবে এবং আপন মালিককে খুঁজিতে থাকিবে। শেষে তাহাকে তালাশ করিয়া বাহির করিবে এবং বলিবে, আমি তোমারই সম্পত্তি, যাহার যাকাত তুমি আদায় কর নাই।
রেওয়ায়ত ২৩. মালিক (রহঃ) উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর যাকাত সম্পৰ্কীয় পত্রটি পাঠ করিয়াছিলেন। ইহাতে নিম্নরূপ বিবরণ লিখিত ছিলঃ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। যাকাত সম্পর্কে এই পত্রটি লিখিত, (পাঁচ হইতে) চব্বিশ পর্যন্ত উটে প্রতি পাঁচটিতে একটি ছাগল ধার্য হইবে। চব্বিশ হইতে পয়ত্রিশ পর্যন্ত উটে একটি এক বৎসর বয়সী উষ্ট্রী ধার্য হইবে। এক বৎসর বয়সের উষ্ট্রী না থাকিলে দুই বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী গ্রহণ করা যাইবে। পঁয়ত্রিশ হইতে পয়তাল্লিশটি পর্যন্ত দুই বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে। পঁয়তাল্লিশ হইতে ষাট পর্যন্ত তিন বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে। ষাট হইতে-পঁচাত্তর পর্যন্ত সংখ্যায় চার বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে। পঁচাত্তর হইতে নব্বই পর্যন্ত সংখ্যায় দুই বছর বয়সের দুইটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে। নব্বই হইতে একশত বিশটি পর্যন্ত উটে তিন বৎসর বয়সের দুইটি উষ্ট্রী ধার্য হইবে। একশত বিশের উর্ধ্বে প্রতি চল্লিশটিতে দুই বৎসর বয়সের একটি উষ্ট্রী এবং প্রতি পঞ্চাশটিতে তিন বৎসর বয়সের একটি করিয়া উষ্ট্রী ধার্য হইবে। চারণভূমিতে বিচরণরত ছাগলের সংখ্যা চল্লিশটি হইলে চল্লিশ হইতে একশত বিশ পর্যন্ত একটি বকরী ধার্য হইবে। একশত বিশ হইতে দুইশত পর্যন্ত দুইটি বকরী এবং দুইশত হইতে তিনশত পর্যন্ত তিনটি বকরী ধার্য হইবে। পরে প্রতি শতে একটি করিয়া বকরী আদায় করিতে হইবে। যাকাতের ক্ষেত্রে ছাগল গ্রহণ করা হইবে না। এমনিভাবে দোষযুক্ত এবং বৃদ্ধ পশুও ইহাতে গ্রহণ করা হইবে না। যাকাত উসুলকারী ব্যক্তি যদি ভাল মনে করেন তবে তাহা লইতে পারেন। যাকাত ধার্য হওয়ার ভয়ে পশুর বিভিন্ন দলকে একত্র বা দলকে বিভক্ত যেন করা না হয়।[1] একদল পশুতে যাহারা শরীক আছেন তাহারা যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে বরাবর হিস্যার ভাগী হইবেন। রৌপ্য পাঁচ উকিয়া পরিমাণ হইলে ইহাতে এক-চত্তারিংশ যাকাত দিতে হইবে।
রেওয়ায়ত ২৭. মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট একশত উট ছিল। যাকাত উসুলকারী তাহার নিকট আসিল না, এমনকি দ্বিতীয় বৎসরও অতিক্রান্ত হইয়া গেল। আর এই দিকে মাত্ৰ পাঁচটি উট ছাড়া তাহার বাকি সমস্ত উট মরিয়া গেল। এই অবস্থায় যাকাত উসুলকারী তাহার নিকট হইতে এই পাঁচটি উটের দুই বৎসরের যাকাত প্রতি বৎসরের একটি করিয়া বকরী দুই বৎসরের দুইটি বকরী আদায় করিবে। কারণ যাকাত আদায় করার দিন যে সম্পদ মালিকের নিকট অবশিষ্ট থাকে কেবল ইহারই যাকাত আদায় করিতে হয়। সুতরাং তাহার মালিকানাধীন পশু যদি মারা যায় বা তাহা বৃদ্ধি পায় তবে সেই অনুসারেই তাহাকে যাকাত প্রদান করিতে হইবে। যদি কয়েক বৎসরের যাকাত বকেয়া হইয়া যায় তবে যাকাত উসুলকারী ঐ ব্যক্তির নিকট মওজুদ পশুগুলির যাকাত উসুল করবে। যদি সমস্ত পশু বিনষ্ট হইয়া যায় বা বিনষ্ট হওয়ার পর যাহা অবশিষ্ট রহিল তাহা যদি নিসাব পরিমাণ না হয় তবে আর উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। এবং বিগত বৎসরগুলির বকেয়াও তাহাকে আদায় করিতে হইবে না।
রেওয়ায়ত ২৬. সুফইয়ান ইবন আবদুল্লাহ (রাঃ) বর্ণনা করেন, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) যাকাত উসুলকারী হিসাবে নিযুক্ত করিয়া তাহাকে এক অঞ্চলে পাঠাইয়াছিলেন। বকরী গণনা করার সময় তিনি বাচ্চাগুলিকেও গণনায় শামিল করিয়া নিতেন। ইহাতে এলাকাবাসিগণ তাহাকে বলিলেনঃ বাচ্চাগুলিকে আপনি গণনায় শামিল করেন কিন্তু যাকাতের মধ্যে ইহাকে গ্রহণ করেন না কেন? যাহা হউক, যাকাত উসুল করিয়া ফিরিয়া আসার পর উমর (রাঃ)-এর নিকট এলাকাবাসীদের প্রশ্নের কথা উল্লেখ করিলে তিনি বলিলেনঃ হ্যাঁ, বকরীর বাচ্চা এমনকি যে সমস্ত বাচ্চা রাখালগণকে কোলে তুলিয়া নিয়া যাইতে হয় সেই ধরনের বাচ্চাগুলিকে পর্যন্ত গণনায় শামিল করা হইবে। কিন্তু যাকাতের বেলায় এইগুলি আমরা গ্রহণ করি না। খাওয়ার উদ্দেশ্যে পালিত মোটাতাজা বকরী, বাচ্চারা যাহার দুধের উপর নির্ভরশীল তেমন বাচ্চাওয়ালা বকরী, ছাগ, গর্ভবতী বকরও আমরা যাকাতে গ্রহণ করি না। এক বৎসর দুই বৎসর বয়সের যাহা একেবারে বাচ্চা নহে বা একেবারে বৃদ্ধ নহে এমন ধরনের বকরীই আমরা ইহাতে গ্রহণ করিয়া থাকি। মালিক (রহঃ) বলেনঃ কাহারও নিকট যদি নিসাব পরিমাণ হইতে কম বকরী থাকে আর যাকাত উসুলকাবীর আগমনের একদিন পূর্বেও যদি এই বকরীগুলির বাচ্চা জন্মে এবং ইহাতে নিসাব পরিমাণ হইয়া যায় তবে তাহার উপর যাকাত ওয়াজিব হইবে। কারণ গণনার বেলায় বকরীর বাচ্চাও বকরীর মধ্যে শামিল হইয়া থাকে। পক্ষান্তরে কাহারও নিকট যদি নিসাব পরিমাণের কম বকরী হয়, পরে ক্রয় বা হেবা বা ওয়ারিস সূত্রে সে যদি আরও কিছু বকরীর মালিক হয় এবং ইহাতে তাহার নিকট নিসাব পরিমাণ বকরী হইয়া যায়, তবে তাহার উপর যাকাত ওয়াজিব হইবে না। প্রথমোল্লিখিত মাসআলাটির নজীর হইল- কাহারও নিকট যদি নিসাব পরিমাণ হইতে কম মূল্যের সম্পদ থাকে, আর সে যদি এমন লাভে ইহা বিক্রয় করে যাহাতে নিসাব পরিমাণ হইয়া যায়, তবে পুঁজির সহিত লাভের উপরও যাকাত ধার্য হইবে। কিন্তু ঐ লাভ যদি হেবা বা মিরাস আকারের হয় তবে হেবা বা ওয়ারিস সূত্রে প্রাপ্তির দিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত ইহাতে যাকাত ওয়াজিব হইবে না। মালিক (রহঃ) বলেনঃ সুতরাং লাভ যেমন পুঁজি ও সম্পদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া থাকে তদ্রুপ বকরীর সঙ্গে শামিল বলিয়া গণ্য হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ অন্য একটি দিক হইতে এই পূর্বোল্লিখিত বিষয় দুইটির মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতাও রহিয়াছে। তাহা হইল-কাহারও নিকট যদি এতটুকু পরিমাণ স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকে যতটুকুর উপর যাকাত ওয়াজিব হয়, পরে যদি ঐ ব্যক্তি অন্য আরও কোন সম্পদ অর্জন করে তবে পূর্বস্থ নিসাবের সঙ্গে ইহা সম্পৃক্ত হইবে না এবং যেদিন হইতে ইহা অর্জিত হইয়াছে সেইদিন হইতে পূর্ণ এক বৎসর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত উহাতে যাকাত ধার্য হইবে না। পক্ষান্তরে কাহারও নিকট যদি উট, গাভী ও বকরী ইত্যাদি নিসাব পরিমাণ পশু থাকে এবং পরে যদি আরও কিছু পশু তাহার অধিকারে আসে তবে পূর্বস্থ নিসাবের সমজাতীয় পশুর সঙ্গে এইগুলির উপরও যাকাত আদায় করিতে হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ এই মাসআলাটির বিষয়ে আমি যাহা শুনিয়াছি উক্ত ভাষাটিই তন্মধ্যে অধিক উত্তম।
রেওয়ায়ত ২৮. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন- উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ)-এর সম্মুখে একবার উসুলকৃত যাকাতের বকরী পেশ করা হইল। তিনি ইহার মধ্যে বড় স্তনওয়ালা একটি দুধাল বকরী দেখিতে পাইয়া বলিলেনঃ এইটি কোথা হইতে আসিল? জবাবে বলা হইল, এইটিও যাকাতের। উমর (রাঃ) বলিলেনঃ ইহার মালিক নিশ্চয়ই সস্তুষ্টচিত্তে ইহা দেয় নাই। মানুষকে তোমরা অসুবিধায় ফেলিবে না। সর্বোত্তম জিনিস কখনও যাকাতে উসুল করিবে না, আর মানুষের রিযিক ছিনাইয়া নেওয়া হইতে বিরত থাক। মুহাম্মদ ইবন ইয়াহইয়া ইবন হাব্বান (রহঃ) বলেনঃ আশজা কবীলার দুই ব্যক্তি আমাকে বলিয়াছেন- মুহাম্মদ ইবন মাসলামা আনসারী (রাঃ) তাহাদের কবীলায় যাকাত উসুল করিতে আসিতেন এবং যাহাদের উপর যাকাত ফরয তাহাদিগকে নিজ নিজ যাকাত হাজির করিতে বলিতেন। যাকাত আদায়ে উপযুক্ত কোন বকরী হইলে তাহাই তিনি গ্রহণ করিতেন। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট ইহাই সুন্নত। আমাদের মদীনার আলিমগণকে ইহার উপরই আমল করিতে দেখিয়াছি যে, যাকাত উসুলের বেলায় মানুষের উপর কোনরূপ অসুবিধার সৃষ্টি করা উচিত নহে, বরং যাকাত প্রদানকারিগণ যাহা পেশ করে তাহা যাকাতে লওয়ার মত হইলেই কবুল করিয়া নেওয়া উচিত।
রেওয়ায়ত ২৯. আতা ইবন ইয়াসার (রহঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ পাঁচ ধরনের ব্যক্তি ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তির জন্য যাকাত গ্রহণ করা হালাল নহে। উক্ত পাঁচ ব্যক্তি হইলেন (এক) আল্লাহর পথে যুদ্ধরত মুজাহিদ, (দুই) সরকার কর্তৃক নিযুক্ত যাকাত উসুলকারী কর্মচারী, (তিন) ঋণগ্রস্ত, (চার) যে ব্যক্তি ইহা দরিদ্র ব্যক্তি হইতে খরিদ করিয়া নেয়, (পাঁচ) প্রতিবেশী কোন দরিদ্র ব্যক্তি যদি তাহাকে ইহা হাদিয়া হিসাবে প্রদান করে তবে সেই ব্যক্তি ধনী হইলেও ইহা গ্রহণ করা তাহার জন্য যায়েয হইবে। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আমাদের নিকট যাকাতের মাল বণ্টনের বিষয়টি ইসলামী সরকারের বিবেচনার উপর নির্ভরশীল। যাহারা বেশি অভাবী বা সংখ্যায় বেশি– সরকার যতদিন প্রয়োজন মনে করিবেন তাহাদিগকে দিবেন। কিছুদিন পর অন্য কোন ধরনের লোক বেশি অভাবগ্রস্ত বা সংখ্যায় বেশি হইলে তাহাদিগকেও দিতে পারেন। মোট কথা, এই বিষয়টি হইতেছে অভাব ও সংখ্যার উপর নির্ভরশীল। আস্থাভাজন আলিমগণের নিকট হইতে আমি উল্লিখিত বক্তব্যই শুনিতে পাইয়াছি। মালিক (রহঃ) বলেনঃ যাকাত উসুলকারী কর্মচারীর জন্য নির্দিষ্ট কোন অংশ যাকাতে নাই। ইহা ইসলামী শাসনকর্তার ইখতিয়ারাধীন। যতটুকু দেওয়া উপযুক্ত মনে করিবেন তাহাই দিবেন।
রেওয়ায়ত ৩১. যায়দ ইবন আসলাম (রহঃ) বর্ণনা করেন, উমর ইবন খাত্তাব (রাঃ) একবার কিছু দুগ্ধ পান করেন। ইহা তাহার নিকট অত্যন্ত সুস্বাদু এবং ভাল বলিয়া মনে হইল। তিনি তখন যে ব্যক্তি দুধ পান করাইয়াছিল তাহাকে বলিলেনঃ এই দুধ কোথা হইতে আনিয়াছ? সে বলিলঃ আমি একটি জলাশয়ে গিয়াছিলাম, সেখানে যাকাতের কিছু পশু পানি পান করিতেছিল। উপস্থিত লোকেরা উহাদিগকে দুগ্ধ দোহন করিয়া আমাকেও কিছু দিল। আমি আমার পানপাত্রে উহা সংরক্ষণ করিয়া রাখিয়া দিয়াছিলাম। আপনি যাহা পান করিলেন ইহা তাহাই। উমর (রাঃ) তখন গলদেশে আঙুল প্রবেশপূর্বক উহা বমি করিয়া ফেলিয়া দিলেন। মালিক (রহঃ) বলেনঃ আল্লাহ্ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত কোন একটি ফরযকে যদি কেউ অস্বীকার করে আর মুসলিমগণ যদি তাহার দ্বারা উহা আদায় করাইতে না পারে তবে আদায় না করা পর্যন্ত তাহার সঙ্গে জিহাদ করা কর্তব্য।
রেওয়ায়ত ৩২. মালিক (রহঃ) বলেনঃ উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ)-এর জনৈক কর্মচারী তাহাকে লিখিয়া জানাইল যে, এক ব্যক্তি স্বীয় সম্পদের যাকাত আদায় করিতে অস্বীকার করে। উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ) তখন তাহাকে বলিলেনঃ ছাড়িয়া দাও। অন্যান্য মুসলিম ব্যক্তির সহিত তাহার যাকাত লইও না। যাকাত প্রদানে অনিচ্ছুক এ ব্যক্তি ইহা জানিতে পারিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইল এবং তাহার সম্পদের যাকাত প্রদান করার জন্য ঐ কর্মচারীর নিকট লইয়া আসিল। তখন ঐ কর্মচারী এই বিষয়ে ফয়সালা জানিতে চাহিয়া পুনরায় উমর ইবন আবদুল আযীয (রহঃ)-এর নিকট পত্র লিখিলে তিনি উত্তর দিলেনঃ তাহার যাকাত গ্রহণ করিয়া নাও।