। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, কুরাইশরা ইয়াহুদীদের বলল, তোমরা আমাদেরকে এমন কিছু শিখিয়ে দাও যে প্রসঙ্গে আমরা এই ব্যক্তিকে (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে) প্রশ্ন করতে পারি। ইয়াহুদীরা বলল, তোমরা রূহ প্রসঙ্গে তাকে প্রশ্ন কর। বর্ণনাকারী বলেনঃ তারা রূহ (বা প্রাণ) বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করল। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “লোকেরা রূহ প্রসঙ্গে তোমার নিকট প্রশ্ন করে। বল, রূহ আমার প্রতিপালকের আদেশ ঘটিত। জ্ঞানের খুব সামান্যই তোমাদেরকে প্রদান করা হয়েছে"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৮৫)। ইয়াহুদীরা বলল, “আমাদের বিরাট বা প্রচুর জ্ঞান দান করা হয়েছে। আমাদেরকে তাওরাত কিতাব দেয়া হয়েছে। আর যাদেরকে তাওরাত গ্রন্থ দেয়া হয়েছে তাদেরকে প্রভূত কল্যাণ দেয়া হয়েছে। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “বল, আমার প্রতিপালকের কথাগুলো লেখার জন্য সমুদ্রের সমস্ত পানি যদি কালি হয়ে যায় তবুও তা আমার প্রভুর কথাগুলো লিখে শেষ করার পূর্বেই নিঃশেষ হয়ে যবে। আমরা যদি আবার একই রকম কালি নিয়ে আসি তুবও তা যথেষ্ট হবে না"- (সূরা কাহফ ১০৯)। সহীহঃ আত্তা’লীকাত আল-হাসসান (৯৯) আবূ ঈসা বলেন, উল্লেখিত সনদসূত্রে এ হাদীসটি হাসান সহীহ গারীব।
। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে মাদীনায় একটি কৃষি খামারে যাচ্ছিলাম। তিনি খেজুর গাছের ডালে ভর দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে তিনি একদল ইয়াহুদীদেরকে অতিক্রম করলেন। তাদের কিছু লোক বলল, তোমরা যদি তাকে প্রশ্ন করতে? তাদের অপর কতক বলল, তাকে কোন প্রশ্ন করো না। অন্যথায় তিনি এমন কিছু শুনিয়ে দিবেন যা তোমাদের মনোপূত হবে না। তারা বলল, হে আবূল কাসিম! আমাদেরকে রূহ (প্রাণ) প্রসঙ্গে বলুন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুক্ষণ দাঁড়ালেন। তিনি তার মাথা আসমানের দিকে উঠালেন। আমি বুঝে ফেললাম যে, তার উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছে। ওয়াহী অবতরণ শেষে তিনি বললেনঃ “রূহ আমার প্রতিপালকের হুকুম মাত্র। তোমাদেরকে জ্ঞানের খুব অল্পই প্রদান করা হয়েছে"। সহীহঃ বুখারী (৪৭২১), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। আবূ হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন লোকদেরকে তিন শ্রেণীতে ভাগ করে উঠানো হবে। একদল লোক পায়ে হেঁটে, দ্বিতীয় দল সাওয়ারী অবস্থায় এবং তৃতীয় দল অধঃমুখে (এবং পা উপরে তুলে) হাযির হবে। প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! এরা মুখমণ্ডলে ভর করে চলবে কিভাবে? তিনি বললেনঃ যে মহান সত্তা তাদেরকে পায়ের সাহায্যে হাটিয়ে ছিলেন, তিনি তাদেরকে মুখমণ্ডলে ভর করে হাটাতেও সক্ষম। এরা নিজেদের মুখের দ্বারা প্রতিটি উচু-নীচু ও কাটা উপেক্ষা করে রাস্তা পার হবে। যঈফ, মিশকাত, তাহকীক ছানী (৫৫৪৬), তা’লীকুর রাগীব (৪/১৯৪) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান। উহাইব (রাহঃ) ইবনু তাউসের সূত্রে, তিনি তার পিতা হতে আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে একই রকম হাদীস বর্ণনা করেছেন।
বাহয ইবনু হাকীম (রহঃ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত, তিনি (দাদা) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামত দিবসে তোমাদেরকে পদব্রজে ও সওয়ারী অবস্থায় সমবেত করা হবে এবং কতককে মুখের উপর (উপুড় করে) হেঁচড়িয়ে হাযির করা হবে। হাসানঃ তা’লীকুর রাগীব। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
সাফওয়ান ইবনু আসসাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেনঃ কোন এক সময় দুই ইয়াহদীর একজন অপরজনকে বলল, চল আমরা এই নবীর কাছে গিয়ে তাকে কিছু প্রশ্ন করি। অপরজন বললঃ তাকে নবী বল না। কেননা সে যদি এটা শুনে ফেলে যে, তুমি (ইয়াহুদীরাও) তাকে নবী বলছ, তার চার চোখ হয়ে যাবে। তারা উভয়ে তার নিকটে এসে তাকে আল্লাহ তা'আলার নিম্নোক্ত বাণী প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেঃ “আমরা মূসাকে নয়টি নিদর্শন দান করেছিলাম" (সূরাঃ বাণী ইসরাঈল১০১)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সেই নয়টি নিদর্শন (নির্দেশ) হচ্ছেঃ (১) তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার সাথে কোন কিছু অংশীদার করো না, (২) যেনা-ব্যভিচার করো না, (৩) যাকে হত্যা করা আল্লাহ তা'আলা নিষিদ্ধ করেছেন ন্যায়সঙ্গত কারণ ছাড়া তার জীবন সংহার করো না, (৪) চুরি করো না, (৫) যাদুটোনা করো না, (৬) কোন নিরপরাধ লোককে সরকারের কাছে অপরাধী বানিয়ে খুন করতে নিয়ে যেও না, (৭) সুদ খেও না, (৮) কোন সতী- সাধ্বী মহিলার বিরুদ্ধে যেনার মিথ্যা অপবাদ দিও না এবং (৯) যুদ্ধক্ষেত্র হতে পালিয়ে যেও না।হে ইয়াহুদী সম্প্রদায়! বিশেষ করে তোমরা শনিবারের বাধ্যবাধকতা অতিক্রম করো না। তারপর ইয়াহুদী শ্রোতা দু'জন তার পা দুটিতে ও হাত দুটিতে চুমা দিয়ে বললঃ আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিঃসন্দেহে আপনি নবী। তিনি বললেনঃ তাহলে তোমাদের দু’জনকে ইসলাম গ্রহণে কিসে বাধা দিচ্ছে? তারা উভয়ে বললঃ দাউদ আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা'আলার নিকটে দু'আ করেছিলেন তিনি যেন বরাবর তার বংশধরদের মধ্য হতেই নবী পাঠান। অনন্তর আমাদের আশংকা হচ্ছে, আমরা যদি ইসলাম কুবুল করি তাহলে ইয়াহুদীরা আমাদেরকে মেরে ফেলবে। যঈফ, ইবনু মাজাহ (৩৭০৫) আবূ ঈসা বলেনঃ এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তোমার নামাযে স্বর (কিরআত) উচ্চ করো না এবং অতিশয় ক্ষীণও করো না”— (সূরা বনী ইসরাঈল ১১০) মক্কায় অবতীর্ণ হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উচ্চ স্বরে কুরআন তিলাওয়াত করলে মুশরিকরা কুরআনকে গালি দিত এবং এর অবতীর্ণকারী (আল্লাহ তা'আলা) ও এর বাহককেও (জিবরীলকে) গালি দিত। তারপর আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেনঃ “তোমার নামাযের কিরআত উচ্চস্বরে পাঠ করো না” অর্থাৎ আপনি উচ্চ স্বরে কুরআন পাঠ করবেন না, অন্যথায় কুরআন, এর অবতরণকারী ও এর বাহককে গালি দেয়া হবে। “এবং তা ক্ষীণস্বরেও পড়বে না", তাহলে আপনার সাথীরা শুনতে পাবে না, (বরং মধ্যম আওয়াজে তা পাঠ করুন) যাতে তারা আপনার নিকট হতে কুরআন শিখতে পারে। সহীহঃ বুখারী (৪৭২২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান।
। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা'আলার বাণীঃ “তোমার নামাযের কিরআত না উচ্চস্বরে পড়বে, আর না নিম্ন স্বরে, এ দুইয়ের মধ্যবর্তী মাত্রার আওয়াজ অবলম্বন কর”— (সূরা বনী ইসরাঈল ১১০) অবতীর্ণ হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আত্মগোপন করে ছিলেন। তিনি তার সাহাবীদের নিয়ে নামায আদায়ের সময় উচ্চস্বরে কিরাআত পাঠ করতেন। মুশরিকরা তা শুনতে পেয়ে কুরআনকে, এর অবতরণকারীকে এবং এর বাহককে গালি দিত। অতএব আল্লাহ তা'আলা তার নবীকে বললেনঃ “তোমার নামাযে উচ্চস্বরে কিরআত পাঠ করো না”, কারণ মুশরিকরা তা শুনে কুরআনকে গালি দেয়। “আবার এত নীচু স্বরেও পড়বে না”, যাতে তোমার সাহাবীদের শুনতে অসুবিধা হয়, বরং “এই দুইয়ের মধ্যবর্তী মাত্রার আওয়াজ অবলম্বন কর”। সহীহঃ বুখারী (৪৭২২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
যির ইবনু হুবাইশ (রাহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রাযিঃ)-কে প্রশ্ন করলাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বাইতুল মাকদিসে নামায আদায় করেছেন? তিনি বললেন, না। আমি বললাম, হ্যাঁ তিনি নামায আদায় করেছেন। তিনি বললেন, হে টেকো! তুমি এ ধরনের কথা বলছ, তা কিসের ভিত্তিতে বলছ? আমি বললাম, কুরআনের ভিত্তিতে। কুরআন আমার ও আপনার মাঝে ফাঈসালা করবে। হুযাইফা (রাযিঃ) বললেন, কুরআন হতে যে ব্যক্তি দলীল গ্রহণ করল সে কৃতকার্য হল। সুফইয়ান (রাহঃ) বলেন, তিনি (মিসআর) কখনো “কাদ ইহতাজ্জা” আবার কখনো “কাদ ফালাজা” বলেছেন। তারপর তিনি (যির) এই আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ “পবিত্র মহান সেই সত্তা, যিনি এক রাতে তার বান্দাকে মাসজিদুল হারাম হতে দূরবর্তী মসজিদে নিয়ে গেলেন"- (সূরা বনী ইসরাঈল ১)। হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, এ আয়াতের মাধ্যমে কি তুমি প্রমাণ করতে চাও, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে নামায আদায় করেছেন? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, সেখানে যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামায আদায় করতেন, তাহলে তোমাদের উপরও সেখানে নামায আদায় করা বাধ্যতামূলক হত, যেমন মাসজিদুল হারামে নামায আদায় করা তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। হুযাইফাহ্ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট একটি পশু আনা হল। এর পিঠ ছিল দীর্ঘ এবং (চলার সময়) এর পা দৃষ্টির সীমায় পতিত হয়। তারা দু'জন (মহানবী ও জিবরীল) জান্নাত, জাহান্নাম এবং আখিরাতের প্রতিশ্রুত বিষয়সমূহ দেখার পূর্ব পর্যন্ত বোরাকের পিঠ হতে নামেননি। তারপর তারা দু'জন প্রত্যাবর্তন করেন। তারা যেভাবে গিয়েছিলেন অনুরূপভাবেই ফিরে আসেন (অর্থাৎ সওয়ারী অবস্থায়ই ফিরে আসেন)। হুযাইফাহ (রাযিঃ) বলেন, লোকেরা বলাবলি করে, তিনি বোরাককে বেঁধেছিলেন। কেন এটি তার নিকট হতে পালিয়ে যাবে। অথচ গোপন ও প্রকাশ্য সবকিছু জানার মালিক (আল্লাহ তা'আলা) বোরাককে তার নিয়ন্ত্রণাধীন করে দিয়েছিলেন। সনদ হাসান। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমি কিয়ামতের দিবসে সকল আদম সন্তানের নেতা হব। এতে গর্বের কিছু নেই। আমার হাতেই হামদের (প্রশংসার) পতাকা থাকবে। এতেও গর্বের কিছু নেই। সেদিন আমার পতাকার নিচেই আদম (আঃ) এবং অন্য সকল নবী একত্রিত হবেন। আমিই প্রথম ব্যক্তি যার জন্য যামীন বিদীর্ণ করা হবে (অর্থাৎ আমাকেই সর্বপ্রথম উত্থিত করা হবে)। এতেও গর্বের কিছু নেই। লোকেরা তিনবার ভীতসন্ত্রস্ত হবে। তারপর আদম (আঃ)-এর নিকট এসে তারা বলবে, আপনি আমাদের পিতা আদম। আমাদের জন্য আপনার প্রতিপালকের নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন, আমি এমন এক অপরাধ করেছিলাম যার পরিণতিতে আমাকে পৃথিবীতে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। তোমরা বরং নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা নূহ (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, পৃথিবীর অধিবাসীদেরকে আমি এমন বদ দুআ করেছিলাম, যার কারণে তারা ধ্বংস হয়েছে (আমি এর কারণে লজ্জিত)। অতএব তোমরা ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, আমি তিনটি মিথ্যা বলেছিলাম। (বর্ণনাকারী বলেন) তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তিনি প্রতিটি মিথ্যাকে কৌশল হিসেবে গ্রহণ করে আল্লাহ তা'আলার দীনকে হিফাজাত করেছেন। ইবরাহীম (আঃ) বলবেন তোমরা বরং মূসা (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা মূসা (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, আমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছি। অতএব তোমরা ঈসা (আঃ)-এর নিকট যাও। তারা ঈসা (আঃ)-এর নিকট এলে তিনি বলবেন, আল্লাহ তা'আলাকে বাদ দিয়ে আমার ইবাদাত করা হয়েছে। আমাকে মা’বুদ বানানো হয়েছে। তোমরা মুহাম্মাদ র-এর নিকট যাও। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারা আমার নিকট আসবে এবং আমি তাদের সাথে যাব। ইবনু জুদ'আন বলেন, আনাস (রাযিঃ) বলেছেন, আমি যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি তাকিয়ে আছি, আর তিনি বলছেনঃ আমি জান্নাতের দরজার শিকল ধরে তাতে খটখট আওয়াজ করব। ভেতর হতে বলা হবে, কে? বলা হবে, মুহাম্মাদ। ভেতরের অধিবাসীরা সাথে সাথে আমার সৌজন্যে দরজা খুলে দিবে এবং আমাকে মারহাবা মারহাবা বলে অভিনন্দন জানাবে। তখন আমি সিজদায় পতিত হব। এ অবস্থায় আল্লাহ তা'আলা আমার প্রতি বিশেষ হামদ ও সানা (প্রশংসা ও স্তুতিবাক্য) ইলহাম করবেন (গোপনে শিখিয়ে দিবেন এবং আমি তা পাঠ করতে থাকব)। আমাকে বলা হবে, মাথা তোল, প্রার্থনা কর দেয়া হবে, সুপারিশ কর কবুল করা হবে এবং বল, তোমার কথা শুনা হবে। (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন) এটাই হল সেই মাকামে মাহমূদ’ (উচ্চ প্রশংসিত মর্যাদা), যার কথা আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ “আশা করা যায় তোমার প্রভু তোমাকে মাকামে মাহমুদে সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন"- (সূরা বনী ইসরাঈল ৭৯)। সুফইয়ান (রাহঃ) বলেন, শুধু মাত্র এই কথাটুকুই আনাস (রাযিঃ) হতে বর্ণনা করা হয়েছেঃ “আমি জান্নাতের দরজার শিকল ধরে খটখট আওয়াজ করব"। সহীহঃ ইবনু মা-জাহ (৪৩০৮)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান। এ হাদীসটি কয়েকজন বর্ণনাকারী আবূ নাযরাহ হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে দীর্ঘাকারে বর্ণনা করেছেন।
। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-কে বললাম, নাওফ আল-বিকালী মনে করেন যে, খাযিরের সাথে যে মূসার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি বনী ইসরাঈলের নবী মূসা (আঃ) নন (এরা দু’জন ভিন্ন ব্যক্তি)। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলছে। উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছিঃ বনী ইসরাঈলের জনগণের সামনে মূসা (আঃ) বক্তৃতা দিতে দাঁড়ান। তাকে প্রশ্ন করা হয় যে, কে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী? তিনি বলেন, আমি সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। এতে আল্লাহ তা'আলা তার উপর অসন্তুষ্ট হন। কেননা তিনি আল্লাহ তা'আলার সাথে জ্ঞানকে সম্পৃক্ত করেননি (অর্থাৎ আল্লাহ তা'আলা সবচাইতে বড় জ্ঞানী এ কথা বলেননি)। আল্লাহ তা'আলা তার নিকট ওয়াহী পাঠান, আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত এক বান্দা দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে আছে। সে তোমার চাইতে বেশি জ্ঞানী। মূসা (আঃ) বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমি কি উপায়ে তার সাথে সাক্ষাৎ করব? আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ তুমি থলেতে একটি মাছ লও। মাছটি যেখানে হারিয়ে ফেলবে, সেখানেই সে আছে। অতএব তিনি রওয়ানা হলেন এবং ইউশা ইবনু নুন নামক তার যুবক শাগরিদও তার সফরসঙ্গী হলেন। মূসা (আঃ) থলের মধ্যে একটি মাছ ভরে নিলেন। তারা দু’জনে পায়ে হেঁটে চলতে চলতে একটি প্রকাণ্ড পাথরের নিকট (সমুদ্রের তীরে) এসে পৌছেন। এখানে দু’জনই শুয়ে বিশ্রাম নিলেন। থলের মধ্যকার মাছটি নড়াচড়া করতে করতে তা হতে বের হয়ে সমুদ্রে পতিত হল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মাছটি দিয়ে পানির স্রোতধারা বন্ধ করে দিলেন। ফলে তা প্রাচীরবৎ হয়ে গেল এবং মাছটির জন্য এভাবে একটি পথের ব্যবস্থা হল। মূসা (আঃ) ও তার যুবক সঙ্গীর নিকট এটা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছিল। তারা দিনের অবশিষ্ট সময় ও রাতে অগ্রসর হতে থাকলেন। তার সঙ্গী মাছের অবস্থা সম্পর্কে তাকে জানাতে ভুলে গেল। ভোর হলে মূসা (আঃ) তার সঙ্গীকে বললেন, “আমাদের সকালের নাশতা নাও। আজকের সফরে আমরা অত্যধিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছি”— (সূরা কাহফ ৬২)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তাদেরকে যে স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেখান পর্যন্ত পৌছতে তারা ক্লান্ত হননি। কিন্তু নির্দেশিত স্থান পার হওয়ার পরই তাদেরকে ক্লান্তিতে পেয়ে বসে। “যুবক বলল, আমরা যখন সেই প্রস্তরময় প্রান্তরে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন কি ঘটনা ঘটেছে তা কি আপনি লক্ষ্য করেননি? মাছের প্রতি আমার কোন লক্ষ্য ছিল না। আর শাইতান আমাকে এমনভাবে ভুলিয়ে দিয়েছে যে, আমি আপনার নিকট তা উল্লেখ করতেও ভুলে গেছি। মাছ তো আশ্চর্য রকমভাবে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেছে। মূসা বললেন, আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম”— (সূরা কাহফ ৬৪)। তারা দু'জনেই তাদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে এলেন। সুফইয়ান সাওরী (রহঃ) বলেন, কিছু লোকের ধারণা যে, এই প্রস্তরময় ময়দানে (বা সমুদ্র তীরেই) আবে হায়াতের ঝর্ণা রয়েছে। এই পানি মৃত ব্যাক্তির উপর ছিটিয়ে দিলে সে জীবিত হয়ে উঠে। এই মাছের কিছু অংশ খাওয়াও হয়েছিল। ঐ ঝর্ণার পানির ফোটা মাছের গায়ে পড়লে সাথে সাথে মাছটি জীবিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারা উভয়ে তাদের পায়ের চিহ্ন ধরে অগ্রসর হতে হতে পূর্বের সেই প্রান্তরে এসে পৌছলেন। তারা দেখতে পেলেন, এক ব্যক্তি চাদর লম্বা করে গায়ে দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে আছেন। মূসা (আঃ) তাকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তোমাদের এ জায়গায় তো সালামের প্রচলন নেই (তুমি মনে হয় একজন আগন্তুক)? তিনি বললেন, আমি মূসা (আঃ)। তিনি প্রশ্ন করলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আপনার নিকট আল্লাহ তা'আলার দানকৃত এক বিশেষ জ্ঞান আছে। আমি তা জানি না। আর আল্লাহ তা'আলা আমাকেও এক বিশেষ জ্ঞান দিয়েছেন যা আপনি জানেন না। মূসা (আঃ) বললেনঃ “আপনাকে যে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়েছে, তা শিখার উদ্দেশে কি আমি আপনার সঙ্গে থাকতে পারি? তিনি বললেনঃ আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। আর যে বিষয়ে আপনার কিছুই জানা নেই, সে বিষয়ে আপনি কেমন করেই বা ধৈর্য ধারণ করতে পারেন? তিনি বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। কোন ব্যপারেই আমি আপনার নির্দেশের বিরোধিতা করব না”— (সূরা কাহফ ৬৬-৬৯)। খাযির (আঃ) তাকে বললেন, “ঠিক আছে, আপনি যদি আমার সাথে চলতে থাকেন, তাহলে আপনি আমার নিকট কোন বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন না, যতক্ষণ আমি আপনাকে তা না বলি"- (সূরা কাহফ ৭০)। তিনি (মূসা) বললেন, হ্যাঁ ঠিক আছে। খাযির ও মূসা (আঃ) সমুদ্রের তীর ধরে পায়ে হেঁটে চলতে থাকলেন। তাদের সামনে দিয়ে একটি নৌকা অতিক্রম করছিল। তারা উভয়ে তাদের সাথে কথা বললেন এবং তাদেরকে নৌকায় তুলে নেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খাযিরকে চিনে ফেলল এবং কোন ভাড়া ছাড়াই তাদের দু’জনকে নৌকায় তুলে নিল। খাযির নৌকার একটি তক্তা খুলে নিলেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেন, লোকেরা আমাদেরকে ভাড়া ছাড়াই নৌকায় তুলে নিল, আর আপনি নৌকাটির ক্ষতি সাধন করলেন। আপনি কি তাদের ডুবিয়ে দিতে চান? “আপনার এ কাজটি খুবই আপত্তিকর। খাযির বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সাধে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে না? মূসা বললেন, আমার ভুলের জন্য আপনি আমাকে পাকড়াও করবেন না। আমার ব্যাপারে আপনি অতটা কড়াকড়ি করবেন না”— (সূরা কাহফ ৭১-৭৩)। তারা নৌকা হতে নেমে সমুদ্রের তীর ধরে এগিয়ে যেতে থাকেন। পথিমধ্যে দেখা গেল, একটি বালক অপর কয়েকটি বালকের সাথে খেলাধূলা করছে। খাযির (আঃ) নিজের হাতে ছেলেটির মাথা ধরে তা ঘাড় হতে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন এবং এভাবে তাকে হত্যা করেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেন, “একটা নিষ্পাপ বালককে আপনি মেরে ফেললেন? অথচ সে তো কাউকে হত্যা করেনি! আপনি তো একটা বড় অন্যায় করে ফেলেছেন। খাযির বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি, তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরে চলতে পারবে না"- (সূরা কাহফ ৭৪-৭৫)? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ পূর্বের কথার চেয়ে এ কথাটা বেশি শক্ত ছিল। মূসা (আঃ) বললেন, “অতঃপর আমি যদি আপনার নিকট কোন প্রশ্ন করি, তাহলে আপনি আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না। আমাকে প্রত্যাখ্যান করার মত ত্রুটি আপনি আমার মধ্যে পেয়েছেন। পুনরায় তারা দু'জনে সামনে এগিয়ে গেলেন এবং যেতে যেতে একটি জনপদে এসে পৌছলেন এবং সেখানকার মানুষদের নিকট খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা মেহমান হিসেবে তাদেরকে মেনে নিতে রাজী হয়নি। তারা সেখানে একটি দেয়াল দেখতে পেলেন, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল"- (সূরা কাহফ ৭৬-৭৭)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ দেয়ালটি ঝুঁকে পড়েছিল। খাযির তার হাত দিয়ে দেয়ালটি ঠিক করে দিলেন। মূসা (আঃ) তাকে বললেনঃ আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট আসলাম, যারা আমাদেরকে মেহমান হিসেবেও গ্রহণ করেনি বা আহারও করায়নি। “আপনি ইচ্ছা করলে এই কাজের জন্য মুজরী নিতে পারতেন। খাযির বললেন, ব্যাস। এখানেই তোমার ও আমার একত্রে ভ্রমণ শেষ। তুমি যেসব বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে পারনি, এখন আমি তোমাকে সেসব বিষয়ের তাৎপর্য বলে দিব”— (সূরা কাহফ ৭৭-৭৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা'আলা মূসা (আঃ)-এর উপর রহমত অবতীর্ণ করুন। আমাদের আশা ছিল যে, তিনি যদি ধৈর্য ধারণ করতেন তাহলে আমাদেরকে তাদের এসব বিষয়ের তথ্য জানানো হত! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মূসা (আঃ) শর্তের কথা ভুলে যাওয়ার কারণেই প্রথম প্রশ্নটি করেছেন। তিনি আরো বলেনঃ একটি চড়ুই পাখি এসে তাদের নৌকার কিনারে বসে, তারপর তা সমুদ্রে নিজের ঠোট ডুবিয়ে দেয়। খাযির তাকে বললেন, এই চড়ুই পাখি সমুদ্রের পানি যতটুকু কমিয়েছে, আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহ তা'আলার জ্ঞানভাণ্ডার হতে ঠিক ততটুকুই কমিয়েছে। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রাহঃ) বলেন, ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) পাঠ করলেনঃ “তাদের সামনে ছিল এক বাদশাহ যে প্রতিটি নিখুঁত নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নিত।” তিনি আরো পাঠ করলেনঃ “আর বালকটি ছিল কাফির”। সহীহঃ বুখারী, মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। যুহরী (রাহঃ) এ হাদীস উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ ইবনু উতবাহ ইবনু আব্বাস হতে, তিনি উবাই ইবনু কা'ব হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এ হাদীসটি আবূ ইসহাক আল-হামদানী (রাহঃ) সাঈদ ইবনু জুবাইর হতে, তিনি ইবনু আব্বাস হতে, তিনি উবাই ইবনু কাব (রাযিঃ) হতে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে এই সূত্রে বর্ণনা করেছেন। আবূ মুযাহিম আস-সামারকান্দী বলেন, ‘আলী ইবনুল মাদীনী বলেছেন, আমি হাজ্জে গিয়েছিলাম। আমার হাজ্জের সফরের উদ্দেশ্যই ছিল সুফইয়ান সাওরীকে এ হাদীস বর্ণনা করতে শুনব। তিনি এ হাদীসে একটি বিষয় বর্ণনা করতেন। সুতরাং আমি তাকে বলতে শুনেছি, এ হাদীস আমর ইবনু দীনার আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন। ইতোপূর্বে আমি এ হাদীস সুফইয়ানকে বর্ণনা করতে শুনেছি, কিন্তু তিনি উক্ত বিষয় এতে বর্ণনা করেননি।