। আবদুল্লাহ ইবনু উনাইস আল-জুহানী (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মারাত্মক মারাত্মক কাবীরা গুনাহ হল—আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার স্থাপন করা, বাবা-মার নাফারমানী করা এবং মিথ্যা শপথ করা। কেউ আল্লাহ তা'আলার নামে অপরিবর্তনীয় ও অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রযুক্ত হওয়ার মত শপথ করলে এবং তাতে মশার পাখা বরাবর নগণ্য মিথ্যাও যোগ করলে তা তার অন্তরে কিয়ামত পর্যন্ত একটি কলংকময় দাগ হয়ে বিরাজিত থাকবে। হাসানঃ মিশকাত তাহকীক সানী (৩৭৭৭)। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব। আবূ উমামা আল-আনসারী (রাযিঃ) হলেন সালাবার ছেলে। তার নাম আমাদের জানা নেই। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বেশ কিছু হাদীস বর্ণনা করেছেন।
। 'আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে রয়েছে আল্লাহ তা'আলার সাথে অংশীদার স্থাপন করা, বাবা-মায়ের অবাধ্যা হওয়া, অথবা বলেছেনঃ মিথ্যা শপথ করা। বর্ণনাকারী শুবাহর সন্দেহ যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষোক্ত দুটি কথার কোনটি বলেছেন। সহীহঃ বুখারী। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ।
। মুজাহিদ (রহঃ) হতে বর্ণিত, উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) বলেন, পুরুষরা জিহাদ করে কিন্তু মহিলারা জিহাদ করে না। মীরাসের (উত্তরাধিকার) ক্ষেত্রেও মহিলারা (পুরুষের তুলনায়) অর্ধেক পায়। এ প্রসঙ্গেই কল্যাণময় আল্লাহ তা'আলা অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আল্লাহ তা'আলা যদ্বারা তোমাদের কাউকে অপর কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন, তোমরা তার লোভ করো না। যা পুরুষ অর্জন করেছে তা তার প্রাপ্য অংশ আর নারী যা অর্জন করেছে তা তার প্রাপ্য অংশ। তোমরা আল্লাহ তা'আলার নিকট তার অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। আল্লাহ তা'আলা নিশ্চয়ই সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ”— (সূরা আন্-নিসা ৩২)। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, একই প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত আয়াতও অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) আত্মসমর্পণকারী পুরুষ ও আত্মসমর্পণকারী নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সতবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, লজ্জাস্থান হিফাযাতকারী পুরুষ ও লজ্জাস্থান হিফাযাতকারী নারী, আল্লাহ তা'আলাকে বেশী স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহ তা'আলাকে বেশী স্মরণকারী নারী এদের জন্য আল্লাহ তা'আলা রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান"- (সূরা আল-আহযাব ৩৫)। উম্মু সালামাহ (রাযিঃ)-ই ছিলেন মাদীনায় হিজরতকারিনী প্রথম মহিলা। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি মুরসাল। কেউ কেউ ইবনু আবূ নাজীহ কর্তৃক মুজাহিদ (রহঃ) সূত্রে এটি মুরসাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন যে, উম্মু সালামা (রাযিঃ) এই কথা বলেছেন।
। উম্মু সালামাহ্ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা'আলা স্ত্রীলোকদের হিজরাত প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন বলে আমি শুনিনি। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “আমি তোমাদের মধ্যে কর্মে নিষ্ঠ কোন নর বা নারীর কাজকে বিফল করি না। তোমরা একে অপরের অংশ। অতএব যারা হিজরাত করেছে, নিজেদের আবাস হতে উৎখাৎ হয়েছে, আমার পথে নির্যাতিত হয়েছে.....”— (সূরা আ-লি ইমরান ১৯৫)। পূর্বের হাদীসের সহায়তায় সহীহ।
। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে হুকুম দিলেন তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শুনানোর জন্য। তখন তিনি মিম্বরে বসা ছিলেন। আমি তাকে সূরা আন-নিসা হতে তিলাওয়াত করে শুনলাম। আমি যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌছলাম (অনুবাদ) “আমি যখন প্রত্যেক উম্মাত হতে একজন করে সাক্ষী হাযির করব এবং তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত করব, তখন কি অবস্থা হবে?" (সূরা আন-নিসা ৪১), তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে তার হাত দিয়ে চাপ দেন। আমি তার প্রতি তাকিয়ে দেখলাম, তার দু'চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে। সনদ সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, আবূল আহওয়াস (রাহঃ) আমাশ হতে, তিনি ইবরাহীম হতে, তিনি আলকামাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে এরূপই বর্ণনা করেছেন। মূলত তা হবেঃ ইবরাহীম-উবাইদাহ হতে, তিনি আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে।
। আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমাকে কুরআন হতে তিলাওয়াত করে শুনাও। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপরই তো কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে, আর আমি আপনাকে তা তিলাওয়াত করে শুনাব। তিনি বললেনঃ অন্যের তিলাওয়াত শুনতে আমি পছন্দ করি। অতএব আমি সূরা আন-নিসা তিলাওয়াত করতে শুরু করলাম। আমি পাঠ করতে করতে যখন (অনুবাদ) “এবং আমি তোমাকে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরূপে উপস্থিত করব", তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার দুই চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। সহীহঃ বুখারী (৪৫৮২), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ রিওয়ায়াতটি আবূল আহওয়াসের হাদীসের তুলনায় অনেক বেশি সহীহ। সুওয়াইদ ইবনু নাসর-ইবনুল মুবারাক হতে, তিনি সুফইয়ান হতে, তিনি আমাশ (রাহঃ) হতে মু'আবিয়াহ ইবনু হিশামের হাদীসের অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।
। আলী ইবনু আবী তালিব (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আবদুর রাহমান ইবনু আওফ (রাযিঃ) আমাদের জন্য খাবারের আয়োজন করলেন এবং আমাদেরকে দাওয়াত করে শরাব পান করান। আমাদেরকে এই শরাবের নেশায় ধরে। ইতোমধ্যে নামাযের ওয়াক্ত হয়ে যায়। লোকজন আমাকেই ইমামতি করতে এগিয়ে দেয়। আমি পাঠ করলামঃ “কুল ইয়া আয়্যুহাল কাফিরূন। লা আ'বূদু মা তা’বুদূন। ওয়া নাহনু নাবুদু মা তাবুদুন।" অর্থাৎ “ওয়ালা নাবুদু” (তোমরা যাদের ইবাদাত কর আমরা তাদের ইবাদাত করি না)-এর স্থলে আমি “ওয়া নাহনু নাবুদু মা তাবুদূন” (তোমরা যাদের ইবাদাত কর, আমরাও তাদের ইবাদাত করি) পড়ে ফেললাম। তখন আল্লাহ তা'আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেন (অনুবাদ) “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাযের নিকটেও যেয়ো না, যতক্ষণ না তোমরা যা বল তা বুঝতে পার" (সূরা আন-নিসা ৪৩)। সহীহ। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান গারীব সহীহ।
। ‘আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, কংকরময় হাররা এলাকার একটি (পানিসেচের) নালা নিয়ে এক আনসারীর সাথে তার ঝগড়া বাধে। উক্ত নালার মাধ্যমে তারা খেজুর বাগানে পানি দিতেন। আনসারী বললেন, পানি আসতে নালাটি আপনি ছেড়ে দিন। যুবাইর (রাযিঃ) তা মানলেন না। দু’জনেই বিষয়টি নিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত হলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবাইর (রাযিঃ)-কে বললেনঃ হে যুবাইর! তোমার বাগানে পানি দিয়ে তোমার প্রতিবেশীর জন্য পানি ছেড়ে দিও। এতে আনসারী ব্যক্তি রাগান্বিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইনি আপনার ফুফাতো ভাই বলেই (এরূপ ফাইসালা করছেন)। এ কথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি বললেনঃ হে যুবাইর! তুমি তোমার বাগানের পানি প্রবাহিত করে আলগুলো পর্যন্ত পানি জমা না হওয়া পর্যন্ত নালা অন্যত্র প্রবাহিত হতে দিবে না। যুবাইর (রাযিঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আমার মনে হয় এ ঘটনা প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) “কিন্তু না, তোমার প্রভুর শপথ। তারা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের পারস্পরিক মতভেদের ব্যাপারসমূহের বিচারভার তোমার উপর অর্পণ না করে..."— (সূরা আন-নিসা ৬৫)। সহীহঃ বুখারী (৪৫৮৫), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, আমি মুহাম্মাদ (বুখারী)-কে বলতে শুনেছি, ইবনু ওয়াহব (রাহঃ) এ হাদীসটি লাইস ইবনু সা'দ হতে এবং ইউনুস (রাহঃ) যুহরী হতে, তিনি উরওয়া হতে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ) হতে, এই সূত্রে উক্ত হাদীসের একই রকম বর্ণনা করেছেন। অপর দিকে শু'আইব ইবনু আবী হামযাহ্ (রহঃ) যুহরী হতে, তিনি উরওয়াহ হতে, তিনি যুবাইর (রাযিঃ) হতে, এই সূত্রে এ হাদীস রিওয়ায়াত করেছেন, কিন্তু তাতে 'আবদুল্লাহ ইবনুয যুবাইর (রাযিঃ)-এর উল্লেখ করেননি।
। যাইদ ইবনু সাবিত (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, “তোমাদের কি হল যে, মুনাফিকদের প্রসঙ্গে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে....."— (সূরা আন-নিসা ৮৮) আয়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উহুদ যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীদের (মুসলিম বাহিনীর) মধ্য হতে কিছু সংখ্যক লোক (যুদ্ধক্ষেত্র হতে) ফিরে আসে। তাদের প্রসঙ্গে সাহাবীগণ দুই দলে বিভক্ত হয়ে যান। এক দলের বক্তব্য ছিল, তাদেরকে হত্যা কর। অন্য দলের মত ছিল, তাদেরকে হত্যার প্রয়োজন নেই। এ প্রসঙ্গেই এ আয়াত অবতীর্ণ হয় (অনুবাদ) "তোমাদের কি হল যে, মুনাফিকদের ব্যাপারে তোমরা দুই দল হয়ে গেলে..."— (সূরা আন-নিসা ৮৮)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মাদীনা হল তাইবাহ-পবিত্র নগরী। তা ময়লা আবর্জনা (অপবিত্রতা মুনাফিকী) এমনভাবে দূর করে দেয় যেভাবে আগুন লোহার ময়লা দূর করে দেয়। সহীহঃ বুখারী (৪৫৮৯), মুসলিম। আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান সহীহ। আবদুল্লাহ ইবনু ইয়াযীদ হলেন একজন আনসারী আল-খাতমী, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচার্য পেয়েছেন।
। ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন নিহত ব্যক্তি নিজ হাতে তার হত্যাকারীকে তার কপালের চুল ও মাথা ধরে নিয়ে আসবে। তার ঘাড়ের কর্তিত রগসমূহ হতে রক্ত বের হতে থাকবে। সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! এ লোক আমাকে হত্যা করেছে। এমনকি সে তার হত্যাকারীকে নিয়ে আরশের নিকট পৌছে যাবে। আমর ইবনু দীনার বলেন, লোকেরা ইবনু আব্বাস (রাযিঃ)-এর নিকট (হত্যাকারীর) তাওবার বিষয়ে আলোচনা করলে তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন (অনুবাদ) “কোন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং আল্লাহ তা'আলা তার প্রতি রুষ্ট হবেন, তাকে অভিসম্পাত করবেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত রাখবেন"- (সূরা আন-নিসাঃ ৯৩)। তিনি বলেন, এ আয়াত মানসূখও হয়নি বা তার বিধান পরিবর্তিতও হয়নি। অতএব তার আর তাওবা কিসের। সহীহঃ মিশকাত তাহকীক সানী (৩৪৬৫), তা’লীকুর রাগীব (৩/২০৩) আবূ ঈসা বলেন, এ হাদীসটি হাসান (গারীব)। কেউ কেউ এ হাদীসটি আমর ইবনু দীনার হতে, তিনি ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) হতে এই সূত্রে একই রকম বর্ণনা করেছেন, কিন্তু তা মারফু হিসেবে নয়।